সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে আজ
সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা, ৩২ একর জমিতে হবে ১২ তলার ভবন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৩ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা আজ রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিকেলে এ বৈঠক হওয়ার কথা।
মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় নির্মাণের কাজ শুরু করবে সরকার। এরই মধ্যে ৩২ একর জমিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সচিবালয় নির্মাণের নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১২ তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে আগারগাঁওয়ে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনায় আপত্তি তুলেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাদের আশঙ্কা, বড় স্থাপনা নির্মাণে ওই এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয়ে জায়গার সংকট, অপর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিং, ভবনগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা এবং জলাবদ্ধতার মতো সমস্যার কারণে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর আবদুল গনি রোডের ১৭ দশমিক ৫৭ একর জমিতে আটটি ভবন ও তিনটি টিনশেডে চলছে ৩৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম। অথচ সচিবালয়ে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা এক হাজারেরও কম। বিপরীতে গাড়ি প্রবেশের অনুমতিপত্র বা স্টিকার দেওয়া হয়েছে প্রায় ১০ হাজার। ফলে সচিবালয়ের ভেতরে ও আশপাশের সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়।
সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পাশে বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বিদ্যমান সচিবালয়েই একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সচিবালয়ের পশ্চিম পাশের পরিবহন পুল ও জিপিওর জমি যুক্ত করে নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বর্তমান সচিবালয়সহ তিনটি এলাকা মিলিয়ে প্রায় ১৮ একর জমিতে কমপ্লেক্স নির্মাণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়েছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সচিবালয়ের ভেতরে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও কয়েকটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। তবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সেই প্রস্তাব অনুমোদন দেয়নি। পরে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ স্থগিত রেখে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণের সম্ভাব্যতা ও নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থাপত্য অধিদপ্তরকে।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের পর্যালোচনায় দেখা যায়, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৩৬ একর উন্মুক্ত জায়গা রয়েছে। এর মধ্যে ৩২ একর জমিতে সচিবালয় নির্মাণ সম্ভব বলে মনে করছে অধিদপ্তর। এ জন্য স্থপতি ও বাইরের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তিনটি কমিটি গঠন করে পৃথক নকশা তৈরি করা হয়। নকশাগুলো জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এসব নকশা উপস্থাপন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর একটি নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে জাতীয় সংসদ ভবনের মতো বড় প্রবেশফটক না রেখে অনেকটা মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ার আদলে উন্মুক্ত স্থাপত্য বিন্যাসের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সভায় সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এর পর থেকে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আজ মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি উঠলে পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে অনুযায়ী নকশাও প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। এখন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকারের। নকশা তৈরি করে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়াই স্থাপত্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব।
নতুন সড়ক ও পাতালপথের পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত নকশায় নতুন সচিবালয়ের চারপাশে চক্রাকার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পেছন দিয়ে একটি সড়ক নির্মাণ করে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের (সাবেক গণভবন) পাশ দিয়ে মিরপুর সড়কের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ওই এলাকায় স্কুল, হাসপাতাল, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা থাকায় সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সেগুলো সরানোর প্রয়োজন হতে পারে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিজয় সরণি থেকে আগারগাঁও হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে যাওয়া সড়কের নিচ দিয়ে একটি পাতালপথ নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওপরের সড়ক দিয়ে প্রস্তাবিত সচিবালয়ে প্রবেশ করা যাবে। আর নিচের পথ দিয়ে যানবাহন মিরপুর সড়কের দিকে চলাচল করতে পারবে। এ জন্য পৃথক প্রকল্প নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সচিবালয় স্থানান্তরের পর যানজট নিয়ন্ত্রণই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে।
- বিষয় :
- সচিবালয়