ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সরেজমিন

ইশরাকের অভিযানের পরদিনও জমজমাট সেই মাদক স্পট

ইশরাকের অভিযানের পরদিনও জমজমাট সেই মাদক স্পট
×
×

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২২

রাজধানীর দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং থেকে গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশন পর্যন্ত রেললাইনের পশ্চিম পাশের ঘুণ্টিঘর এলাকায় অর্ধশত মানুষের আনাগোনা। কিশোর থেকে তরুণ, মধ্যবয়সী এমনকি বৃদ্ধরাও রয়েছেন। নারীও আছেন কয়েকজন। তাদের কেউ কাঠের ও প্লাস্টিকের বাক্স বা প্যাকেট নিয়ে বসে আছেন, কেউ ঘুরছেন। তাদেরই কেউ কেউ পকেট থেকে কাগজের পুরিয়া বের করে ক্রেতার হাতে দিয়ে টাকা নিচ্ছেন।

দেখে মনে হয়, হাটে কোনো পণ্য বেচাকেনা চলছে। বেচাকেনা চলছে ঠিকই তবে প্রচলিত পণ্য নয়, মাদকদ্রব্য। সেখানে মূলত গাঁজাই বেশি বিক্রি হতে দেখা গেল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টা প্রকাশ্যেই চলে মাদক কেনাবেচা। গতকাল রোববার বিকেলের চিত্র এটি।

এর আগে গত শনিবার বিকেলে দয়াগঞ্জের ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। অভিযানের ভিডিও তিনি নিজের ফেসবুক পেজে আপলোড করেন। তাতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে কিছু বলছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর পাশ থেকে একজন বলে ওঠেন, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন।

এদিকে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিমন্ত্রীর এমন অভিযান নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা। এর পরই সেই এলাকার চিত্র দেখতে গতকাল রোববার সেখানে যান এই প্রতিবেদক। তিনি সেখানে অবাধে মাদকদ্রব্য বিক্রি হতে দেখেন। আগের দিন অভিযানে কয়েকজনকে আটক করা হলেও এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।

কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কেনাবেচা চলে। ২৪ ঘণ্টাই গাঁজা, ইয়াবাসহ নানা মাদক পাওয়া যায়। প্রতি পুরিয়া গাঁজার দাম ১২০ টাকা। একজন খুচরা বিক্রেতা দিনে কয়েক হাজার টাকার মাদক বিক্রি করেন। যারা বড় চালান নিয়ে আসেন, তারা লাখ টাকার বিক্রি করেন।

সেখানে কথা হয় এক নারী মাদক বিক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গাঁজা বিক্রি বন্ধ হলে আমাকে এখানে দেখা যেত না। আমার ছেলেমেয়েরাও এগুলো খাওয়া শিখেছে।’

‎পাশ থেকে আরেক নারী বলেন, ‘আমার স্বামী মাদক নিতে নিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আমিও বিক্রি করি, চলতে তো হবে।’

‎স্থানীয়রা জানান, আগে থেকেই সেখানে মাদক কেনাবেচা হয়। কয়েক মাস ধরে কেনাবেচা অনেক বেড়েছে। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও ক্রেতা ভেবে ডাকাডাকি করে মাদক ব্যবসায়ীরা। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

‎স্থানীয় বাসিন্দা বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ‘আগেও এখানে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হতো। কয়েক মাস ধরে কেনাবেচা বেড়েছে। অফিসে যাওয়া-আসার সময় মাদক ব্যবসায়ীরা ডাকাডাকি করে। বাধ্য হয়ে এই পথ এড়িয়ে চলি।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হলেও মাদক কেনাবেচা থেমে নেই। গত শনিবার এলাকার জনপ্রতিনিধি ঢাকা-৫ আসনের এমপি ইশরাক হোসেন অভিযোগ করেছিলেন, পুলিশ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তিনি অন্তত ৩০-৪০ বার পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা একেক সময় একেক কথা বলে। তাদের জনবল কম, গাড়ি নেই– এসব কথা বলে। এর আগে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মাদক ব্যবসায়ীরা দূর থেকে গুলি করে দেয়। সে কারণে তাঁর হাতে অস্ত্র ছিল। কিন্তু তিনি গুলি করেননি, কাউকে ভয়ও দেখাননি। অভিযান করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।

জানতে চাইলে গেণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান খান সমকালকে বলেন, ‘জায়গাটিতে মাদক কেনাবেচা হওয়ায় আমরা প্রায় অভিযান চালাই। যখনই অভিযানে যাই তখন ২০-৩০ জনকে গ্রেপ্তার করি। কিন্তু আবার সেখানে কেনাবেচা চলে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মূলত স্থানটিতে ভাসমান লোকজন অনেক বেশি। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আমাদের তালিকায় যারা আছে, তাদের অধিকাংশকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

তদন্ত করছে পুলিশ

দয়াগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ। ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তে আইনের ব্যত্যয়ের তথ্যপ্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই কথা বলেন।

আরও পড়ুন

×