ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

গণশুনানি

কমিশন বাড়াতে ব্যবসায়ীদের চাপ, এলপিজির দাম বৃদ্ধির শঙ্কায় ভোক্তারা

কমিশন বাড়াতে ব্যবসায়ীদের চাপ, এলপিজির দাম বৃদ্ধির শঙ্কায় ভোক্তারা
×
×

ছবি: ফাইল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:৩৩ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:৩৩

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) কমিশন বাড়াতে আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা একযোগে দাবি তুলেছেন। পাশাপাশি এলপিজি বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা। এসব প্রস্তাব নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

শুনানিতে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবের তুলনায় কম হারে কমিশন ও বিভিন্ন চার্জ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বিইআরসির কারিগরি কমিটি। এসব সুপারিশ কার্যকর হলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি দাম বর্তমান এক হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৯৭৬ টাকা হতে পারে। তবে দেশে চলমান সরবরাহসংকট, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ায় গণশুনানিতে প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা প্রতিনিধিরা।

আজ রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত শুনানিতে ব্যবসায়ীরা কমিশন ও বিভিন্ন ধাপের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব তুলে ধরেন। অন্যদিকে, ভোক্তা প্রতিনিধিরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।

বর্তমানে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারে আমদানিকারকদের কমিশন ২০০ টাকা। এটি বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। বিইআরসির কারিগরি কমিটি আমদানিকারকদের কমিশন ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮০ টাকা করার সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ, সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ৮০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি। অন্যদিকে, পরিবেশকেরা কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার আবেদন করেছেন। কারিগরি কমিটি খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৭০ টাকা করার সুপারিশ করলেও পরিবেশকদের কমিশন ১৫০ টাকা করার দাবির বিষয়ে একই ধরনের সুপারিশ করেনি। অটোগ্যাস স্টেশন মালিকেরাও প্রতি লিটারে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন।

এলপিজি বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছে। বর্তমানে মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ ও অপারেটরের প্ল্যান্ট থেকে পরিবেশক পর্যন্ত পরিবহনসহ চার্জ প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা। ব্যবসায়ীরা তা বাড়িয়ে ২৭ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ৩৬ টাকা ৯২ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটি এই চার্জ প্রতি কেজিতে ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা করার সুপারিশ করেছে।

পরিবেশক পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতার আঙিনা পর্যন্ত পরিবহনসহ চার্জ বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা। এটি বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা করার প্রস্তাব এসেছে। কারিগরি কমিটি এই চার্জ ৬ টাকা ৬৭ পয়সা করার সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতার চার্জ বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। ব্যবসায়ীরা তা বাড়িয়ে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা থেকে ৭ টাকা ৫০ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কারিগরি কমিটি প্রতি কেজিতে এই চার্জ ৫ টাকা ৮৩ পয়সা করার সুপারিশ করেছে।

ব্যবসায়ীরা যুদ্ধের প্রভাব, জাহাজভাড়া, পরিবহন ব্যয় ও পরিচালন খরচ বৃদ্ধিকে কমিশন বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগে জাহাজভাড়াসহ প্রিমিয়াম প্রতি টনে ৮০ থেকে ১২০ ডলার থাকলেও এখন তা ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে উঠেছে। সব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এমন দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কেউ গ্যাস বিক্রি করতে না পারে।

তবে ভোক্তা প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন, ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধির দাবি বিবেচনায় নেওয়া হলেও গ্রাহকেরা কেন নির্ধারিত দামে এলপিজি পাচ্ছেন না। অক্টোবরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপরও বাজারে অনেক গ্রাহককে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা খলিলুর রহমান শুনানিতে বলেন, এলপিজির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করা বিইআরসির দায়িত্ব। তা না হলে এই শুনানি সঠিক হবে না। তিনি দাম না বাড়ানোর পাশাপাশি বিইআরসি ঘোষিত দরে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

শুনানিতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, গত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগে কয়েকটি কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও সেসব অভিযোগের নিষ্পত্তির আগেই কেন কমিশন বৃদ্ধির শুনানি হচ্ছে। তার দাবি, বাড়তি দামে বিক্রির মাধ্যমে এক মাসে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে।

এদিকে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর খুচরা ব্যবসায়ীদের ১১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এই জরিমানার মাধ্যমে ৬৩০ কোটি টাকা বাড়তি আদায় বৈধ হয়ে গেল কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। শুনানিতে এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় তিনি অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে শুনানি বর্জনের ঘোষণা দেন।

শুনানিতে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারাও আমদানিকারক ও অপারেটরদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন। তাদের অভিযোগ, সরবরাহসংকট দেখা দিলে কোম্পানিগুলো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে হওয়ায় বিইআরসি নির্ধারিত দামে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, আমদানি করতে না পারা কয়েকটি কোম্পানির পক্ষ থেকে বাজারে পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।

জবাবে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার তদারকি জোরদার করা হচ্ছে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজ চলছে।

গণশুনানি শেষে প্রস্তাবের বিষয়ে লিখিত মতামত জমা দেওয়ার জন্য ১ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছে কমিশন। এরপর প্রস্তাব ও মতামত পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×