ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

নাক দিয়ে বের হয়েছিল রক্ত, খোঁজ মিলছে না তাহসিফের মোটরসাইকেলের

নাক দিয়ে বের হয়েছিল রক্ত, খোঁজ মিলছে না তাহসিফের মোটরসাইকেলের
×
×

কে এম তাহসিফ সাউরি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:১৬

রাজধানীর উত্তরখান থানা এলাকার তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের পর তার সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশ। এতে বলা হয়েছে, তাহসিফের নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা যায়। তবে শরীরের কোথাও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার পেট ফোলা ছিল।

বুধবার বিকেলে মরদেহ উদ্ধারের পর বাহ্যিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেন টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজুর রহমান।

সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহসিফের উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। তার মাথার চুল কালো, মুখে ছোট ছোট কালো দাড়ি ও গোঁফ ছিল। চোখ ও মুখ বন্ধ ছিল। দুই হাত মাথার সামনে বাঁকানো এবং মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় ছিল। বুক, পেট, পিঠ, দুই পা ও যৌনাঙ্গ স্বাভাবিক ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল কালো রঙের ফুলহাতা কাবলি শার্ট ও সাদা ট্রাউজার।

নৌ পুলিশের তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহসিফের হাতে একটি ঘড়ি ও পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ওই ফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

নিখোঁজের সময় সঙ্গে ছিল মোটরসাইকেল, এখন খোঁজ নেই
তাহসিফ রাজধানীর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের এ ব্লকের ১৪ নম্বর কবরী-২ ভবনের ৩০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। প্রায় চার বছর ধরে বাবা-মা ও দুই ভাইবোনের সঙ্গে ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। তার গ্রামের বাড়ি খুলনার সোনাডাঙ্গায়। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তিনি অবিবাহিত ছিলেন।

বিমানবাহিনীতে চাকরি চলে যাওয়ার পর তাহসিফ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে কাজ করতেন। তার ছোট বোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করেছেন। ছোট ভাই একাদশ শ্রেণিতে পড়ে।

তাহসিফের ফুফা এজাজ হোসেন সমকালকে বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর থেকে তার আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। বর্তমানে তার মোটরসাইকেলটিও বাসার গ্যারেজে নেই। সেটি কোথায়, তা পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেননি।

এজাজ হোসেন বলেন, ‘আমরা দ্বীপের সঙ্গেও কথা বলেছি। কিন্তু তাহসিফের বাইকটি মিসিং। পুলিশ আমাদের কাছে বাইকের ডিটেইলস, ছবি চেয়েছে। আমরা দিয়েছি।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় এক মাস আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন তাহসিফ। এরপর তাকে মোটরসাইকেল চালাতে নিষেধ করেছিল পরিবার।

বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে আর ফেরেননি
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম হেলাল জানান, গত মঙ্গলবার দিনভর মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছিলেন তাহসিফ। বাবার জন্যও কিছু জিনিস কিনেছিলেন। সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামের তার এক পরিচিত তরুণ বাসার নিচে এসে তাকে ডাকেন। দ্বীপের সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন জানিয়ে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর আর ফেরেননি।

রাতে তাহসিফ বাসায় না ফেরায় তার মা একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের মুঠোফোনে একটি বার্তা পাঠান তাহসিফ। তাতে তিনি বাসায় ফিরছেন বলে জানান। তবে বার্তাটি পড়ে ছেলেকে কিছুটা ব্যস্ত মনে হয়েছিল বলে জানান তার বাবা।

এনায়েতুল করিম বলেন, ‘ওই রকম কিছু বলে নাই। তবে মাঝে মাঝে আমাকে বলত আতঙ্কিত।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, তাহসিফের সঙ্গে সেদিন কী ঘটেছিল, তা জানতে দ্বীপের সঙ্গে কথা বলেছেন তারা। দ্বীপ তাদের জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে তাহসিফের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছিলেন তিনি। পরে তাহসিফকে তার বাসার এলাকার কাছে রেখে ফিরে যান।

তাহসিফের বাবা জানান, বুধবার দুপুরে ছেলের খোঁজে তিনি তুরাগ থানায় গিয়েছিলেন। তখন পুলিশ তার ছেলের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। পরে বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে উত্তরখান থানা থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয়, তাঁর ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

তাহসিফের বাবা আরও জানান, যেখান থেকে ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেদিকে তাহসিফ যেতেন বলে তাদের জানা নেই।

মোটরসাইকেলের তথ্য চেয়েছে পুলিশ
তাহসিফের ফুফা এজাজ হোসেন বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে দ্বীপের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তবে তাহসিফের মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিশ মোটরসাইকেলের বিস্তারিত তথ্য ও ছবি চেয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে সেগুলো সরবরাহ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে উত্তরার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাহসিফের বাবা ছেলের মরদেহ আনতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। বাসার ভেতরে স্বজনেরা শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।

বাসার নিরাপত্তাকর্মী কবির বলেন, তাহসিফ যখন বাসা থেকে বের হন, তখন তিনি দায়িত্বে ছিলেন না। অন্য একজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্বে ছিলেন। তার ভাষ্য, তাহসিফ ভালো ছেলে ছিলেন।

তাহসিফের এক স্বজন বলেন, ‘এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন

×