৮ বছরের সন্তানের দায়িত্ব নেবে কে
এক্সপ্রেসওয়ের ক্রেনের নিচে পড়ে প্রকৌশলী নিহত
সন্তানকে নিয়ে প্রকৌশলী এবিএম আহসান উল্লাহ আরিফের এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩১
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মায়ের জন্য খাবার নিয়ে রাইড শেয়ারের মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন প্রকৌশলী এবিএম আহসান উল্লাহ আরিফ। রাজধানীর মগবাজার রেলক্রসিংয়ের কাছে পৌঁছলে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত একটি ক্রেন তাঁর বাইকটিকে ধাক্কা দেয়। এতে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যান আরিফ। তাঁর কোমর থেকে নিচের অংশের ওপর দিয়ে চলে যায় ক্রেনের লোহার চাকা। মুহূর্তেই পেটের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসে। কোমর থেকে বাকি শরীর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রক্তে ভেসে যায় পিচঢালা পথ।
গত ১৮ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে ঘটে এই রোমহর্ষক দুর্ঘটনা। পথচারীরা গুরুতর অবস্থায় আরিফকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চার দিন আইসিইউতে থাকার পর ২২ অক্টোবর মারা যান তিনি।
দুর্ঘটনার পর পথচারীরা ক্রেনচালক মেহেদী হাসান সানিকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। হাতিরঝিল থানা পুলিশ ক্রেনটি জব্দ করে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো জেভি। তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠেছে।
নিহত আরিফের ছোট ভাই ডা. এবিএম ইয়াসিন উল্লাহ সমকালকে জানান, তাঁর মা সেলিনা বেগম নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ইউনিভার্সেল হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মুগদার বাসা থেকে মায়ের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছিলেন আরিফ। ওই খাবার দিয়ে মা নাশতা খাবেন। চারদিন পর মা সুস্থ হয়ে উঠলেও ভাইকে বাঁচাতে পারেননি। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে মায়ের শারীরিক অবস্থা এখন খুব খারাপ।
নিহত আহসান উল্লাহ আরিফ (৩৭) মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল, নটর ডেম কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরকৌশল বিষয়ে স্নাতক শেষে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। তাফরেজউল্লাহ আরশ নামে তাঁর ৮ বছর বয়সী একটি ছেলে ও স্ত্রী রয়েছেন।
নিহতের ফুফাতো ভাই সাদেক হোসেন ভুঁইয়া বাদী হয়ে গত ১৯ অক্টোবর হাতিরিঝিল থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় দেখা যায়, দুর্ঘটনায় রাইড শেয়ার চালক ফারুক মিয়া মারাত্মক জখম হলেও প্রাণে বেঁচে যান।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, সকাল ৮টার দিকে রাস্তায় কোনো ভিড়ও ছিল না। চালকের অবহেলা ছাড়া এ রকম দুর্ঘটনার কোনো কারণ নেই। এমনকি ওই মুহূর্তে কোনো ট্রেনও রেললাইন দিয়ে যাতায়াতের খবর তারা পাননি।
সাদেক হোসেন বলেন, আরিফের স্ত্রী ও তাঁর সন্তানের সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
ক্রেন দুর্ঘটনায় আরিফ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক মো. সুমন সমকালকে বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। অভিযোগপত্র দিতে একটু সময় লাগবে।
এ বিষয়ে এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক মো. মোরতোজা এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি। গত সোমবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো জেভির গুলশানের ১১৩ নম্বর সড়কের ৪/এ হোল্ডিংয়ে অবস্থিত অফিসে গেলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ঢুকতে দেয়নি। অভ্যর্থনাস্থলে দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, সাংবাদিক এলে ঢুকতে দেওয়া ও কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করা যাবে না বলে তাদের নির্দেশ দেওয়া আছে।
সিনোহাইড্রোর অবহেলায় আগেও ঘটেছে মৃত্যু
এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে এ রকম দুর্ঘটনা এই প্রথম নয়। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার কারণে এর আগেও এমন প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্লাইওভার নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কখনোই নেওয়া হয়নি।
২০২৩ সালের ২৯ মে মহাখালীতে এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজ চলাকালীন ওপর থেকে রড পড়ে ১২ বছরের এক শিশুর ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। রডটি শিশুর মাথার ভেতর ঢুকে যায়।
এ ছাড়া ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট উত্তরায় এক্সপ্রেসওয়ের (বিআরটি) নির্মাণকাজের সময় একটি গার্ডার নিচে থাকা প্রাইভেটকারের ওপর পড়ে। তখন প্রাইভেটকারে থাকা চালকসহ পাঁচজনের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। ক্রেন দিয়ে গার্ডারটি ওঠানোর সময় ক্রেনের তার ছিঁড়ে গার্ডারটি প্রাইভেটকারের ওপর পড়ে। প্রাইভেটকারে একজন পুরুষ, দুজন নারী ও দুটি শিশু ছিল। তারা এক আত্মীয়ের বৌভাতের নিমন্ত্রণ থেকে ফিরছিলেন।
দুটি দুর্ঘটনায় নাম এসেছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো জেভি শ্যাংডং হাই স্পিড লিমিটেডের। আর উত্তরার বিআরটি দুর্ঘটনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল চীনা কোম্পানি গাজুবা গ্রুপ করপোরেশন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে তদন্তে প্রমাণিত। প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে কাজ করার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তে উঠে আসে। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত কারও শাস্তি হয়নি। আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন বলে জানা যায়। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, যে কোনো নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ব্যাপারে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি বিশদ নির্দেশিকা রয়েছে। যখনই কোনো উন্নয়নকাজ কোনো ঠিকাদারকে দেওয়া হয়, তখন সেই নির্দেশিকা মেনে চলা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। কী ধরনের নির্মাণকাজের জন্য কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিকাদার রাখবে, তার বিশদ বিবরণও দেওয়া আছে। এমনকি নির্মাণ শ্রমিকের জীবন বীমা থাকাও বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেখা যায়, শ্রমিকের জীবন বীমা তো নেই-ই, এমনকি কাজ করতে গেলে যেভাবে আশপাশ ঘিরতে হয়, সেটাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো করে না। যে কারণে বারবার দুর্ঘটনা ঘটে।