রাজধানীতে নগর বন
রাজধানীর বনানীতে এক কিলোমিটারজুড়ে গড়ে উঠছে নগর বন। আঁকাবাঁকা পথের মাঝে প্রকৃতির সান্নিধ্য পাবেন নগরবাসী। আছে ২২০ প্রজাতির গাছ, লতাগুল্ম, জলাশয়। সম্প্রতি তোলা সমকাল
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৭ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ১০:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে মহাখালীর দিকে এগোতেই বনানীতে চোখে পড়ল এক টুকরো বন। কাকলী মোড় থেকে কামাল আতাতুর্ক সড়কে প্রবেশের মুখে ছোট ছোট গাছের সারি, লতাপাতায় ঘেরা পথ, ঝোপঝাড়ের আড়ালে ছোট্ট ছোট্ট জলাশয়। কোথাও চিকন পাতার বাঁশ, কোথাও থাই সুপারি। আবার কোথাও আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা। তুলসী থেকে কদম, বাঁশ, আখ থেকে বেত; নানা প্রজাতির গাছের সমারোহ। একটি গাছের পাশে আরেকটি গাছ; কোথাও লতাগুল্ম জড়িয়ে আছে বৃক্ষের গায়ে।
মাঝ দিয়ে চলে গেছে আঁকাবাঁকা হাঁটার পথ। হাঁটতে হাঁটতে কোথাও চোখে পড়ে ছোট জলাধার; কোথাও ঝর্ণার মতো গড়িয়ে পড়ছে পানি। পানির ওপর ছায়া ফেলেছে সবুজের পরত। ঝোপের ভেতর প্রজাপতির ওড়াউড়ি। নানা রকম পোকামাকড়ের আনাগোনা।
বনানীর এই নগর বন প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ; আয়তন প্রায় ১২ হাজার বর্গমিটার। বন বিভাগ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে গড়ে উঠছে এই বন। এই নভেম্বরেই এটি উদ্বোধনের কথা। বনটি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে পথচারীরা ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বনের ভেতর দিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে পারেন। ফুটপাত দিয়ে চলা ক্লান্ত পথিকের জন্য রাখা হয়েছে বসার ব্যবস্থা।
বনের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখা ঢাকা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শারমীন আক্তারের সঙ্গে। তিনি উদ্বোধনের আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি তদারকি করছিলেন।
তিনি জানালেন, এই জায়গায় একসময় আবর্জনা ছিল। গত জানুয়ারিতে শুরু হয় নগর বন তৈরির কাজ। সেই আবর্জনার স্তূপ এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে সবুজে ঘেরা এক অরণ্যে। আমরা চাই, মানুষ এই বনের পাশ দিয়ে হাঁটবেন; প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখবেন।
তিনি জানান, শুধু এই এক কিলোমিটার এলাকা নয়; বনানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচেও সবুজায়ন করা হয়েছে। ফুটপাতের পাশেও গাছ লাগানো হয়েছে। ফলে সড়কের পাশে হাঁটার সময়ও সবুজের ছোঁয়া পাবেন পথচারীরা। প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে এই উদ্যোগ। উদ্বোধনের পর দুই বছর বনটির পরিচর্যা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকবে বন বিভাগ।
এখানে শুধু বড় গাছ নয়; ছোট ছোট গাছ, ফুল, ঔষধি গাছ, লতাগুল্ম, ঝোপঝাড় মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে এক বৈচিত্র্যময় পরিবেশ। শারমীন আক্তার জানান, নগর বনে দেশীয় ফলদ, ফুল, ঔষধি, শোভাবর্ধক, কনিফার, গুল্ম, ঝোপালো, কাঠ জাতীয়সহ ২২০ প্রজাতির গাছ রয়েছে। গাছগুলো এমনভাবে লাগানো হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিক বনের মতো পরিবেশ তৈরি হয়।
বনটি গড়ে তুলতে মাটির প্রস্তুতিতেও বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছে। দো-আঁশ মাটির সঙ্গে ভার্মি কম্পোস্ট, কোকোডাস্ট, রাইস হাস্ক, বোনমিল ও জৈব সার মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে বনোপযোগী পরিবেশ। গাছের নিচে এমনভাবে ঘাস লাগানো হয়েছে, যাতে মাটি থেকে ধুলো উড়ে না আসে। বনের কোথাও উঁচু-নিচু টিলা, কোথাও আঁকাবাঁকা পথ। ছোট ছোট জলাশয়ের মতো পানির আধার রাখা হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। এসব জলাধার ও গাছপালার মধ্যে নগরের নানা প্রাণীর আশ্রয় তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। শহরের ব্যাঙ, বেজি, পাখি ও নানা কীটপতঙ্গ যেন এখানে থাকতে পারে, সে লক্ষ্যেই পরিকল্পনা করা হয়েছে এই বন ঘিরে।
শারমীন আক্তার জানান, সারাদিন বিভিন্ন পাখি এখানে আসে। সন্ধ্যা হলে ব্যাঙের ডাক শোনা যায়। কীটপতঙ্গের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। রাস্তার শব্দদূষণ এখানে কানে আসে না। কিছু গাছ আরেকটু বড় হলে এই পরিবেশ অনেক বদলে যাবে।

শারমীন আক্তার বলেন, নগর জীবনে গাছের বাস্তব উপকারিতা অনুভব করার মতো উদ্যোগ খুব কম দেখা যায়। এমন সবুজ পরিবেশ নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই বনভূমি ঢাকার দূষণ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে মানুষ ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় শুধু বনটি দেখে চলে না যান, বরং কিছু সময় সেখানে কাটাতে পারেন। বিশ্রামকালে গাছের ছায়ায় বসে শুনতে পারেন পাখির ডাক।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাধারণ বনের চেয়ে এ ধরনের নগর বন ১০ গুণ দ্রুত বাড়তে পারে এবং ৩০ গুণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম। ফলে নগরের বায়ুদূষণ কমানো ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এ ধরনের বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া নগর বন ঘিরে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে আয়ের সম্ভাবনাও দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, নগরে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনতে সব সময় বিশাল বনভূমির প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও এক টুকরো জায়গায় শত প্রজাতির গাছ, লতাগুল্ম, পানি আর প্রাণের আশ্রয় তৈরি করেও নগরবাসীকে প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায়। যে শহরে মানুষ প্রতিদিন ধোঁয়া, ধুলো আর যানজটের মধ্যে হাঁটেন, সেখানে এক টুকরো বনই হয়ে উঠবে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার ঠিকানা।