ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গরিবের চিকিৎসালয় 'রাড্ডা'

গরিবের চিকিৎসালয় 'রাড্ডা'
×

রাজধানীর মিরপুরের 'রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি'র চিকিৎসালয়ে সন্তান কোলে মায়েদের দীর্ঘ লাইন - মাহবুব হোসেন নবীন

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৫:০৩

মায়ের কোলে চড়ে ১৫ মাসের আরাফাত টিকা নিতে মঙ্গলবার শীতের সকালেই হাজির রাজধানীর মিরপুরে। 'রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি'র মূল সেন্টারটি মিরপুর ১০ নম্বরে। আরাফাত ছাড়াও ওই সময় টিকার জন্য মায়ের সঙ্গে অপেক্ষায় ছিল আরও জনাবিশেক শিশু। লাইনে দাঁড়ানো নারী-শিশুর বেশভূষা দেখেই অনুমান করা গেল, তারা অধিকাংশ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত। সুশৃঙ্খলভাবে একে একে শিশুর টিকা নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটছেন মা।

পাশেই আরেকটি কক্ষে দেওয়া হচ্ছিল অন্তঃসত্ত্বা নারীর সেবা। সেই কক্ষে চিকিৎসা নিতে আসা ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ঝর্ণা আক্তার বলেন, 'বাইরের যে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে রাড্ডাতে চিকিৎসা খরচ অনেক কম। তাই চিকিৎসার প্রয়োজনে এখানেই ছুটে আসি। সেবিকা ও চিকিৎসকরাও আন্তরিক।' দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে দরিদ্র মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে আছে 'রাড্ডা'। দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি এখন সেখানে সেবা নেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরাও। রাড্ডার একাধিক সেন্টার থেকে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ মা ও শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

রাড্ডা বারনেন (সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেন) নামে এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৩ সাল থেকে বাংলাদেশে কাজ করছে। দুই দশক সুইডিশরা চিকিৎসালয়টির রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছিলেন। এক পর্যায়ে তারা নিজেদের গুটিয়ে নিলে ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাড্ডা বারনেন থেকে 'রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি' সেন্টার ট্রাস্ট গঠিত হয়। মিরপুর ১০ এলাকায় প্রধান কেন্দ্র ছাড়াও মিরপুর ১, বাউনিয়াবাদ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম বিস্তৃত। রাড্ডার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন হলেন সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ এশিয়ার নোবেলখ্যাত ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি তাহরুন্নেসা আব্দুল্লাহ, সদস্য বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক টি এ চৌধুরী, এ এস এম কাশেম ও আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী।

ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, সমাজের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষের সেবাকেন্দ্র হিসেবে রাড্ডা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। অসংখ্য সেবাপ্রত্যাশীর নির্ভরতার জায়গা এই প্রতিষ্ঠান। এই মহতী কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করা হবে।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার জানান, বিদেশিদের রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান ট্রাস্টের আওতায় পরিচালিত হয়ে স্বনির্ভর হওয়ার নজির দেশে খুব কম।

'ভূমিদস্যুদের কবল থেকে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রক্ষা করো' :মিরপুর ১০-এর মূল কেন্দ্রের বাইরে রাড্ডার দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র মিরপুর ১-এ। সেখানে সাঁটানো ব্যানারে লেখা- 'ভূমিদস্যুদের কবল থেকে মা, শিশুর আশীর্বাদ স্বাস্থ্যকেন্দ্র রক্ষা করো'। ওই কেন্দ্রের সেবাপ্রত্যাশী আইনুন নাহার বলেন, 'দুই প্রজন্ম ধরে সেবা নিচ্ছি। কানাঘুষা শুনছি, রাড্ডাকে এখান থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এটা হলে এলাকাবাসী প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।'

সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে পাঁচ দশক ধরে মিরপুর ১ নম্বরে ১০ কাঠা জমির ওপর রাড্ডা চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে এই জমির মালিকানা দাবি করছে দুটি পক্ষ। একটি মিরপুর ১-এর 'সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি', অন্যটি 'বাচ্চু গং'। আর সরকারি সংস্থা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, এই জমির মালিক তারা। 'সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি'কে তারা বরাদ্দ দেয় এই জমি। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার মাধ্যমে গৃহায়নের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন পর এই জমির দখল পেতে তৎপর 'সমমনা দোকানদার সমিতি'। তবে ব্যক্তি মালিকানার সম্পত্তি দাবি করা মিরপুর ১ নম্বরে দক্ষিণ বিশিলের বাসিন্দা ফরহাদ বেপারী বলছেন, বংশানুক্রমিক এই জমির ২৪ জন উত্তরাধিকার। তাদের কাছ থেকে 'পাওয়ার অব অ্যাটর্নি' নিয়ে মামলা চালিয়ে আসছেন। সর্বশেষ উচ্চ আদালত থেকে তার পক্ষে রায় হয়। তবে গৃহায়ন অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জোয়ার্দার তাবেদুন্নবী বলেন, 'যে দাগের জমিতে মিরপুর ১-এর রাড্ডার স্থাপনা, সেটি গৃহায়নের অধিগ্রহণ করা জমি। সম্প্রতি উচ্ছেদের নোটিশ পেয়ে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আইন কর্মকর্তা আপিল বিভাগে রিভিউ করেন। এরপর আদালত আগের আদেশ স্থগিত করেন।'

ঢাকা-১৪ আসনের এমপি আগা খান মিন্টু বলেন, 'রাড্ডার জায়গায় তারাই থাকবে, এটা এলাকাসীর দাবি। তারা দীর্ঘ বছর এলাকার মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। যে ব্যক্তি রাড্ডার জায়গা নিজের বলে দাবি করছেন, তিনি একজন প্রতারক।'

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবুল কাশেম মোল্লা বলেন, 'বিএনপির আমলে সমমনা নামে ওই সমিতি তৎকালীন মন্ত্রী ও গৃহায়নের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাড্ডার জায়গা ভাগিয়ে নিয়েছিল। বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টুর বোন ফেরদৌসী আহম্মেদ মিষ্টিও তাদের সঙ্গে আছেন। আর সিটি জরিপেও বলা আছে, ওই জায়গায় হাসপাতাল রয়েছে। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আদালতে আমরা লড়ছি।'

সমমনা দোকানদার সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম হাজরা বলেন, 'নিয়ম মেনে গৃহায়নের জায়গা তারা বরাদ্দ পান। জামায়াত-শিবির ও বিএনপির লোক বলে যে অভিযোগ, তা সঠিক নয়।'

রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, 'এটি যখন গৃহায়ন থেকে অন্য কোনো সংগঠনের নামে বরাদ্দ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তখনও রাড্ডা ওই জায়গায় বসে জনগণকে সেবা দিয়ে যাচ্ছিল। তাহলে কীভাবে অন্য সংগঠনকে বরাদ্দ দেওয়া হলো।'

আরও পড়ুন

×