রাজস্ব সংস্কার, ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে আইএমএফের প্রশ্ন
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশের রাজস্ব খাতের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ভর্তুকির জন্য সরকার আর্থিক সংকটের মধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এখানেও আইএমএফের অস্বস্তি রয়েছে। আইএমএফের কাছ থেকে তিন বছর মেয়াদে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনায় সংস্থাটির এমন পর্যবেক্ষণ অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে গত রোববার এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আইএমএফের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণের ওপর নির্ভর না করে তাদের আগের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। নতুন কর্মসূচিতে কঠিন শর্ত থাকলে তা মেনে ঋণ নেওয়া হবে না। অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ও অন্যান্য প্রক্রিয়া চলমান।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার আগে সরকার ইতোমধ্যে আইএমএফের কাছে সংস্কার পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল সভার ফাঁকে আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এসব সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারই আলোচনার মূল বিষয় হবে। ফলে এ দুই খাতের সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশ যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এনবিআরের জমা দেওয়া পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ হলো, এতে মূলত চলতি অর্থবছরে বেশি রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে রাজস্ব আদায় বাড়াতে কীভাবে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
সূত্র জানায়, আইএমএফের কর্মকর্তারা এনবিআরের প্রস্তাবিত পরিকল্পনাকে উচ্চতর রাজস্ব আদায়ের জন্য যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য মনে করেননি। ঘাটতি কমিয়ে আনতে অর্থ বিভাগ, আইএমএফ ও এনবিআরের কর্মকর্তারা কাজ করবেন।
অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় প্রধান সংস্কারগুলোর বড় অংশ এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই বাস্তবায়ন হবে। পরবর্তী কর্মসূচিতে রাজস্ব খাতের সংস্কার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। দেশে রাজস্ব আদায় অত্যন্ত কম হওয়ায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। তাই আইএমএফ রাজস্ব বোর্ডের কাছে স্পষ্ট সংস্কার এজেন্ডা এবং তা বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার চাইবে।
ওই কর্মকর্তা জানান, নতুন কর্মসূচির মূল আলোচনা বার্ষিক সভার পর হবে। এ জন্য আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করবে। ওই সফরেই ঋণ কর্মসূচির শর্ত চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা হবে।
ভর্তুকি নিয়ে মতপার্থক্য
এদিকে সংকটময় সময়ে ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করতে গিয়ে সরকারের বিপুল ব্যয়ও নতুন ঋণ কর্মসূচির দরকষাকষিতে বড় বাধা হতে পারে। বাংলাদেশের আগের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমানোর জন্য সরকারকে ধারাবাহিকভাবে তাগিদ দিয়েছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পর ওই উদ্যোগ বাতিল করে।
চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকির জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা এবং এলএনজিতে ভর্তুকির জন্য আরও ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এরই মধ্যে গত আড়াই মাসে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে অর্থ বিভাগ প্রায় ২৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড় করেছে। অবশ্য সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন কর্মসূচির আওতায় অনেক বড় অঙ্কের ভর্তুকি ব্যয় আইএমএফ মেনে নেবে না। কারণ এর সুবিধা ধনী ব্যক্তিরাও পাচ্ছেন। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো বা বন্ধ এবং শুধু গরিবদের দেওয়ার ব্যবস্থা করতে আইএমএফ চাপ দিতে পারে।
পুরোনো সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আগের কর্মসূচিতে থাকা অনেক সংস্কার বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থায় বাস্তবায়ন করা কঠিন। তবে আইএমএফ সেগুলো পুরোপুরি বাদ দিতে রাজি নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সময় পিছিয়ে দেওয়া বা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, এনবিআর সংস্কার ও পুনর্গঠন, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় করা নতুন কর্মসূচিতেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে তা বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩৬০ কোটি ডলারের বেশি ছাড় হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাত সংস্কারে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হওয়ায় পঞ্চম ও ষষ্ঠ কিস্তির প্রায় ১৩০ কোটি ডলার ছাড় স্থগিত হয়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, আগের কর্মসূচির আওতায় ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, করছাড় কমানো, এনবিআর সংস্কারসহ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার কিছু ক্ষেত্রে সেখান থেকে পিছিয়ে গেছে। ফলে সংস্কারের ধারাবাহিকতা ও সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আইএমএফের প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, কর ব্যবস্থাতেও আগের সংস্কারের ধারাবাহিকতা নেই । বিভিন্ন করহার কমিয়ে অভিন্ন হারের দিকে যাওয়ার উদ্যোগ থাকলেও ভ্যাটের একীভূত হারের দিকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণীকরণের সময়সীমা ৯০ দিন থেকে আবার ১৮০ দিনে নেওয়ার আলোচনা নিয়েও আইএমএফ প্রশ্ন করতে পারে।
ড. জাহিদ বলেন, আগের সংস্কার থেকে সরে গিয়ে আবার একই সংস্কার করার প্রতিশ্রুতি দিলে আইএমএফকে এর ব্যাখ্যা দিতে হবে। তারা এমনও বলতে পারে— আগের সংস্কারের জায়গায় ফিরে এসে তারপর নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে।