ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি ৪২ হাজার কোটি টাকা

এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি ৪২ হাজার কোটি টাকা
×
×

ছবি: সমকাল

জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৮

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে হোঁচট খেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেই ধারা থেকে বের হতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, চলতি অর্থবছর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বা মূসক রিটার্ন দাখিলে নতুন নিয়ম চালু করার কারণে রাজস্ব আদায় নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। আগে ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দিতে হতো। তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমার দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার কারণে অনেকে জুলাই-আগস্টে রিটার্ন জমা দেননি। ফলে সেপ্টেম্বরে ভ্যাট আদায় কমে গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন থেকে সরে এসে আগের নিয়মে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। 

তবে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, শুধু ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়ম চালু করার কারণে আদায় কমেছে, তা নয়। এর পেছনে এনবিআরের বর্তমান প্রশাসনের দুর্বল ব্যবস্থাপনার দায়ও রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের কর্মচঞ্চলতার ঘাটতিও রয়েছে। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবেও রাজস্ব কম আদায় হচ্ছে। অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনা নিয়ে সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনীতি এখন বেশ চ্যালেঞ্জিং অবস্থায় রয়েছে। ফলে বাজেটে যে বড় প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, তা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। 

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ৯১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক দশমিক ২৩ শতাংশ আদায় বেড়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরের বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। 

তবে আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে আদায় বেড়েছে। এ সময় এ খাত থেকে রাজস্ব এসেছে ৩৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা। সে হিসেবে ঘাটতি রয়েছে ৯ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ঘাটতি হলেও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাত থেকে আদায় বেড়েছে পৌনে ১৭ শতাংশ।

আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ের শুল্ককর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩০ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এ খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। এ খাতে কম আদায় হয়েছে ১২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। তবে আয়করের মতো এ খাতেও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আদায় বেড়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ।

সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে এনবিআর থেকে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। গত ১০-১২ বছর ধরে এনবিআরের তিন অনুবিভাগের মধ্যে রাজস্ব আহরণের প্রধান খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে ভ্যাট। কিন্তু ভ্যাট থেকে যে হারে আদায় কমেছে তা এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। 

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, শুধু ভ্যাট দেওয়ার পদ্ধতি পরিবর্তনই নয়, এর বাইরে বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যাংক থেকে ঋণ সরবরাহ কমে যাওয়া এবং এডিপি বাস্তবায়নের শ্লথগতির কারণেও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীরগতির হওয়ায় সেখান থেকেও পর্যাপ্ত ভ্যাট-ট্যাক্স আসছে না। তিনি বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ভাটা এবং রাজস্ব আদায়ে বড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে এনবিআরকে অনেক বেশি উদ্যম ও চাঞ্চল্য নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। 

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হওয়ার মূল কারণ ভ্যাট। পরীক্ষামূলকভাবে তিন মাস অন্তর অন্তর ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে এ খাত থেকে আদায় কম হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়ে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

×