ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালে

সংস্কার ও প্রস্তুতির তাগিদ জাতিসংঘের, ২৫ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সরকারের

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালে
×
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৪:৫২

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময় আরও তিন বছর পিছিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটবে বাংলাদেশের। নেপালের উত্তরণের সময়ও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

জাতিসংঘে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেনি কোনো দেশ। ফ্রান্স, কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর পক্ষে বক্তব্য দেন। তবে তাঁদের বক্তব্যে বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের তাগিদও ছিল।

এর আগে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে গত ২১ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সুপারিশ পাঠায় জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)। তার আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে জানায়, বাংলাদেশ ও নেপালের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ সাধারণ পরিষদে বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা উচিত। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে বিষয়টি সাধারণ পরিষদে পাঠায় ইকোসক।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর অগ্রগতি প্রতি তিন বছর পরপর মূল্যায়ন করে সিডিপি। এ ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক—এই তিনটি মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়। কোনো দেশ অন্তত দুটি সূচকে নির্ধারিত মান অর্জন করলে অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হলে উত্তরণের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ তিনটি মানদণ্ডেই উত্তীর্ণ হয়েছে।

১৯৭৫ সালে এলডিসির তালিকাভুক্ত হয় বাংলাদেশ। এরপর থেকে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বিভিন্ন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছে দেশটি। ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। এর ভিত্তিতে ২০২১ সালে ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করা হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির অভিঘাত মোকাবিলা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য উত্তরণের সময় দুই বছর বাড়ানো হয়। সে অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তরণের সর্বশেষ নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৬ সালের নভেম্বর।

জাতিসংঘে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ জানায়, উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড পূরণ করলেও ধারাবাহিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটে প্রস্তুতি গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে। কভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যের বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলের সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরা হয়।

দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে আর্থিক খাতের অনিয়ম, গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের জন্য জাতীয় বাজেট থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয়ের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশের আবেদনে বলা হয়, এসব কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর-জিডিপি অনুপাতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংক ও পুঁজিবাজার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংকটে দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতিও ব্যাহত হয়েছে। ফলে উত্তরণের প্রস্তুতির পরিবর্তে সরকারকে সংকট মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব বিবেচনায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ অতিরিক্ত তিন বছর সময় চেয়েছিল।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও দীর্ঘদিন ধরে এলডিসি উত্তরণ তিন থেকে পাঁচ বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, এলডিসি-সুবিধা হারালে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে রপ্তানি খাতে।

তাঁদের মতে, উত্তরণের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় পাওয়া শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরও কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে। উৎপাদিত পণ্য ও সেবায় নগদ সহায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগও সীমিত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। এতে দেশের রপ্তানি ৬ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎসবিধি আরও কঠোর হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে তৈরি পোশাকশিল্পে।

বাড়তি সময়ে সরকারের পরিকল্পনা
অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়তি প্রস্তুতিকালে অন্তত ২৫টি সংস্কার ও প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে সরকার। বাণিজ্য, আর্থিক খাত, রাজস্বব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনার আওতায় দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মুক্ত বাণিজ্য বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া ব্যাংক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা বাড়ানো, সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

×