সৌদি আরবে যৌথ উদ্যোগে সার কারখানা করছে বাংলাদেশ
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৬ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারখানাটি সৌদি আরবেই হবে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের ৫০ শতাংশ করে মালিকানার ভিত্তিতে একটি যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি গঠন করে বছরে ১০ লাখ টন ডিএপি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানার উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে বাংলাদেশে সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সার উৎপাদন ও আমদানির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। দেশে ডিএপির চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন বা আমদানি জটিলতা দেখা দিলে কৃষি উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ে। এ অবস্থায় সৌদি আরবে উৎপাদন করে দীর্ঘমেয়াদে ডিএপি সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি হলে দেশের সার সরবরাহে স্থিতিশীলতা আসতে পারে বলে মনে করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম এশিয়া অনুবিভাগ থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠি এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত ধারণাপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বার্ষিক ১০ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্য
ধারণাপত্র অনুযায়ী, সৌদি আরবে বার্ষিক ১০ লাখ টন উৎপাদন ক্ষমতার একটি ডিএপি কারখানা নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় এখনই নির্ধারণ করা হচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (টেকনো-ইকোনমিক ফিজিবিলিটি স্টাডি) শেষ হওয়ার পর প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি আরবের মধ্যে ৫০:৫০ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি গঠনের কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামোতে ৩০ শতাংশ ইকুইটি এবং ৭০ শতাংশ ঋণ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। ইকুইটি অংশের অর্ধেক করে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব বিনিয়োগ করবে। আর যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি সৌদি আরবের আর্থিক উৎস থেকে ঋণ সংগ্রহ করবে।
ধারণাপত্রে সম্ভাব্য সৌদি অংশীদার হিসেবে সৌদি আরবের খনিজ সম্পদ প্রতিষ্ঠান মা’আদেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি আরবে কাঁচামালের প্রাচুর্যকে এই প্রকল্পের অন্যতম সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং ডিএপি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নিশ্চিত করার দায়িত্ব সৌদি পক্ষের নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার কারখানাটির সম্পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বাই-ব্যাক গ্যারান্টি দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। অর্থাৎ কারখানায় উৎপাদিত ডিএপি সার বাংলাদেশ দীর্ঘ মেয়াদে কিনবে। এ নিশ্চয়তার মেয়াদ ২০ বা ২৫ বছর হতে পারে, তবে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে দেশে বছরে ১০ লাখ টনের ডিএপি সারের প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় চার লাখ ৪০ হাজার টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে পাঁচ লাখ টন সার সংগ্রহের প্রয়োজন হবে। সৌদি আরবে কারখানা স্থাপন করা সম্ভব হলে এই পরিমাণ সার তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

তবে ধারণাপত্রে বলা হয়, দেশের বর্তমান বার্ষিক ডিএপি চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন। এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) বছরে মাত্র প্রায় এক লাখ টন ডিএপি উৎপাদন করে। চাহিদার বাকি অংশ আমদানি করতে হয়।
পাঁচ বছরের মধ্যে উৎপাদনের আশা
প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কারখানাটিতে উৎপাদন শুরুর আশা করা হচ্ছে। ধারণাপত্রে ২০৩০ সাল থেকে কারখানার কার্যক্রম শুরুর সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যৌথ উদ্যোগ কোম্পানিটি দুই দেশের সমান প্রতিনিধিত্বের একটি পরিচালনা পর্ষদের তত্ত্বাবধানে পেশাগতভাবে পরিচালিত হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। প্রথমে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রস্তাবটির মূল বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে একটি অ-বাধ্যতামূলক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রস্তাব রয়েছে। এরপর বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে প্রযুক্তিগত অর্থনৈতিক সমীক্ষা করা হবে। সমীক্ষার ফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার বা বিসিআইসি এবং সৌদি পক্ষ বা মা’আদেনের মধ্যে চুক্তি করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আলোচনা ও সমন্বয়ের জন্য উভয় পক্ষ থেকে ফোকাল পয়েন্ট মনোনয়ন করা হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের মতামত ও আগ্রহের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, বিনিয়োগ কাঠামো, সার কেনার শর্ত এবং বাই-ব্যাক গ্যারান্টির প্রকৃতি ও পরিধি সম্পর্কে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথমে শিল্প মন্ত্রণালয়ে একটি খসড়া ধারণাপত্র পাঠিয়েছিল। পরে শিল্প মন্ত্রণালয় কয়েকটি বিষয়ে সংশোধন ও পরিমার্জনের প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে উৎপাদিত ডিএপি সার কেনার ক্ষেত্রে বাই-ব্যাক গ্যারান্টি দেওয়ার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মত চাওয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় পরে দেশে ডিএপির সম্ভাব্য চাহিদার তথ্য দিয়ে মতামত জানায়।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সমকালকে বলেন, দেশের ডিএপি সারের চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষকের জন্য সার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সৌদি আরবে যৌথ উদ্যোগে কারখানা হলে দীর্ঘ মেয়াদে ডিএপি সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে পুরো উৎপাদন বাংলাদেশে নেওয়ার বাই-ব্যাক গ্যারান্টি থাকলে দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসবে।
তারা আরও বলেন, সার উৎপাদনে জ্বালানি ও কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জ্বালানি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় উৎপাদনকারী হওয়ায় সৌদি আরবে কারখানা স্থাপনে এ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। ফলে আমদানির অনিশ্চয়তা কমিয়ে কৃষকের জন্য সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
- বিষয় :
- সৌদি আরব