অর্থনীতি এবার নদীতে পড়তে পারে
ব্যাংকিং সম্মেলনে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট আয়োজিত ব্যাংকিং সম্মেলনের শেষ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৩১ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অর্থনীতি লাইনচ্যুত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেছেন, অর্থনীতিকে সঠিক লাইনে তোলা না হলে ভবিষ্যতে শুধু লাইনচ্যুত হয়েই ক্ষান্ত হবে না, হয়তো নদীতে গিয়ে পড়বে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা অলিগার্ক শ্রেণি এ জন্য দায়ী। তাই রাষ্ট্রের সংস্কার ছাড়া এ অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের শেষ দিনের প্রথম অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরাতে তিনি অলিগার্কদের প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য দায়িত্বশীলদের প্রতি আহ্বান জানান।
রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম মিলনায়তনে আয়োজিত গতকালের সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব। বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন।
ড. মাহবুব উল্লাহ দেশের ব্যাংকিং খাত ও রাষ্ট্র পরিচালনার সমালোচনা করে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত চরম দুর্বল ও ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে এবং অধিকাংশ ব্যাংক আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বা বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি দেশের মানুষ ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
অলিগার্কদের প্রশ্রয় না দিলে অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরানো যাবে না– এ ধরনের ধারণাকে উৎসাহিত না করার আহ্বান জানান অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশ একটি ‘শোষণমূলক রাষ্ট্র’। রাষ্ট্র নিজেই এমন অল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী অলিগার্ক বা কোটিপতিদের জন্ম দিয়েছে, যাদের স্বার্থে সাধারণ জনগণকে শোষণ করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের সংকটকে অর্থনীতির বড় সংকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো আস্থার চরম অভাব। অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। ব্যাংক পরিচালনায় যদি বাজারের নিয়ম মেনে চলা হতো, তবে এসব দুর্বল ব্যাংকের অধিকাংশই এতদিনে বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু নানা কৃত্রিম উপায়ে সেগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে, যা কতখানি কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে এই চরম সংকটের মধ্যেও দেশে চার থেকে পাঁচটি ব্যাংক ভালো করছে এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এ খাতের সার্বিক উন্নয়নে এসব ভালো ব্যাংকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ব্যাংকিং খাত এখন অনেকটাই সরকারমুখী হয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে যথেষ্ট মনোযোগ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে কীভাবে পরিশোধ করা হবে তা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।
তাঁর মতে, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা দেশের শাসকরা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রকে জনগণের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা না করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা সাম্রাজ্য মনে করেছেন। তারা তাদের সমর্থক, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের অনুগ্রহ ও সুবিধা বিলিয়ে দিয়েছেন, যেটি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান সমস্যা। শিল্পকারখানা বা ব্যাংক বেসরকারীকরণের কথা বলা হলেও মূল সংকট এই শাসকমণ্ডলীর মানসিকতায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যতক্ষণ না গুটিকয় উচ্চাভিলাষী মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাষ্ট্রের এই প্রকৃতি ও চরিত্র পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে, ততক্ষণ টেকসই উন্নয়ন বা কোনো উন্নতি সম্ভব নয়।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। তিনিও দেশের ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে এক অদ্ভুত বিপরীতমুখী চাপ বিরাজ করছে। একদিকে কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে রেকর্ড পরিমাণ অলস বা অতিরিক্ত তারল্য জমা হয়ে আছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে অলস তারল্যের পরিমাণ বেড়ে চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি।
অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে তিনি তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেন। প্রথমত, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল সুশাসন; দ্বিতীয়ত, নমনীয় নীতিমালা এবং বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা প্রদান এবং তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি। তিনি মনে করেন, এসব কারণে ভুয়া ঋণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে আনুমানিক পাঁচ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট উপযুক্ত জামানত বা পরিশোধের সদিচ্ছা ছাড়াই আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে।
অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা বলেন, ব্যাংকের পরিচালক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, দুর্নীতিগ্রস্ত চেয়ারম্যান এবং এমডি সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তঃসংযুক্ত নেটওয়ার্ক ঋণনীতি বিকৃত করেছে এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে বা অকার্যকর করে এসব অপকর্ম চালিয়েছে।
- বিষয় :
- অর্থনীতি