এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত তিন বছর, ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে: দেবপ্রিয়
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ১৩:২৯
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছেন গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তবে তিনি মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত ব্যতিক্রমী। তাই আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে। এতদিন যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে এখন কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে আমরা এটাকে দেখছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা মনে করিয়ে দিচ্ছি, এই সিদ্ধান্তটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন আমাদের ব্যতিক্রমী কৃতিত্ব দেখাতে হবে।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের সময় দেশের রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে আগামী দিনে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এসেছে, সেগুলো থেকে কীভাবে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসা হবে, তার একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেন তিনি। আগামী বাজেটে কোন কোন খাতে এসব সুবিধা বা সহায়তা কতটা কমানো হবে এবং পরবর্তী সময়ে কোন খাতে আরও বেশি সহায়তা দেওয়া হবে, তা পরিষ্কার করতে হবে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘আমরা যে সংস্কারের কর্মসূচি নিয়েছি, সেটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে মানুষের কাছে আনতে হবে।’
পরিকল্পনায় সমন্বয়ের তাগিদ
এলডিসি উত্তরণ সামনে রেখে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, সরকারের অ্যাকশন প্ল্যান, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ত্রিবার্ষিক বাজেটারি কাঠামো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।
এসব পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, এলডিসি উত্তরণের পুরো প্রক্রিয়ার মালিকানা শুধু কোনো একটি মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি পুরো সরকারের এবং দেশের। এ কাজে বেসরকারি খাত, বিদেশি সহযোগী গোষ্ঠী, বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকে যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এই জিনিসের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এগুলোকে যুক্ত করার মতো একটি জাতীয় কর্তব্য আমাদের সামনে এসেছে।’
কথার চেয়ে কাজে গুরুত্ব
এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো। তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। আমরা কথা বলাতে যতখানি পারদর্শী, কাজ করার ক্ষেত্রে ততখানি পারদর্শী—এমন যেন না হয়।’
আগামী তিন বছরকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা আগামী তিন বছর এই ভরসা করতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য পাওয়া অতিরিক্ত সময়কে শুধু কারিগরি বা প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে জনমানুষের স্বার্থ জড়িত। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গত ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ ও ২০২১ সালের পরপর দুই ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় এলডিসি উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডই নির্ধারিত সীমার চেয়ে যথেষ্ট ব্যবধানে পূরণ করেছিল বাংলাদেশ। কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব বিবেচনায় দেশটিকে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি পর্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রস্তুতি পর্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি)।
- বিষয় :
- দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
- এলডিসি