রপ্তানির দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধি আমদানিতে
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানির তুলনায় আমদানিতে দ্বিগুণের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাণিজ্য ঘাটতির ওপর। দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৭৪৭ কোটি ডলারে উঠেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৫৭১ কোটি ডলার। এ সময়ে আমদানিতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় বেড়েছে পেট্রোলিয়াম পণ্যে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১০৫ শতাংশ। এর পরে রয়েছে ভোগ্যপণ্য। সব মিলিয়ে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ও সামগ্রিক লেনদেনে বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল বৃহস্পতিবার চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৯৩৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। এ সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে এক হাজার ১৮৬ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৭ শতাংশ।
এমনিতেই বাংলাদেশের রপ্তানির তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হয়। এর মধ্যে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দর অনেক বেড়ে গেছে। যে কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দিনে অনেক বেড়ে আন্তঃব্যাংকে ডলারের দর ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সায় উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ত্রৈমাসিকে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে খরচ হয়েছে ৪২২ কোটি ডলারের বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে যেখানে ব্যয় ছিল ২০৬ কোটি ডলারের কম। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে খরচ ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়ে ১৪০ কোটি ডলার হয়েছে। প্রাথমিক পণ্যের আমদানি প্রায় ২৩ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৩৫৯ কোটি ডলারে উঠেছে। তবে আরএমজি সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি মাত্র ২ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়ে ৪৬১ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। তবে মূলধনি পণ্যের আমদানি ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ কমে ২৪৬ কোটি ডলারে নেমেছে। অন্য পণ্যে বেড়েছে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেক প্রধান উৎস রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি আছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় তা কম। প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৮৫৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।
এরপরও চলতি হিসাবে ঘাটতি তৈরি হয়েছে ১৩৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল মাত্র ৮২ কোটি ডলার। এ সময়ে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত কমে মাত্র ৩২ কোটি ডলারে নেমেছে। গত বছরের একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ১৮০ কোটি ডলার। প্রথম তিন মাসে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এক কোটি ডলার কমে ৩৫ কোটি ডলারে নেমেছে। অন্য বিনিয়োগ আগের ১৪৮ কোটি ডলার থেকে কমে মাত্র চার কোটি ডলারে নেমেছে।
প্রথম ত্রৈমাসিকে বিদেশি ঋণও কমেছে ব্যাপকভাবে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আগের অর্থবছরের ১০৪ কোটি ডলার থেকে কমে মাত্র ৫৪ কোটি ডলারে নেমেছে। অন্য দীর্ঘমেয়াদি নিট ঋণ ঋণাত্মক ১৭ কোটি ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যা প্রায় আট কোটি ডলার ছিল। অবশ্য ট্রেড ক্রেডিট আগের ১০৮ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ১৩৪ কোটি ডলারে উঠেছে।
সব মিলিয়ে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ১১৬ কোটি ডলার ঘাটতি দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে উদ্বৃত্ত ছিল ৮৫ কোটি ডলার। এ রকম পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ডলারের দর স্থিতিশীল থাকার পর গত কয়েক দিনে বাড়ছে। গত তিন দিন ধরে আন্তঃব্যাংকে ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা। এর আগের দুই দিন বিক্রি হয় ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা। এর আগে গত অক্টোবরের শুরুতে ডলারের দর ১২৩ টাকা ছিল। সেখান থেকে বাড়তে বাড়তে অক্টোবরের শেষ কর্মদিবসে ১২৩ টাকা ৯৯ পয়সা হয়। আওয়ামী লীগ পতনের পর থেকে দেড় বছর আন্তঃব্যাংকে ডলারের দর ১২১ থেকে ১২২ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বুধবার ১০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সপ্তাহে বিক্রি করা হয় আরও ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগ পর্যন্ত তিন বছর রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে কারণে ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর পেরোনো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। সেখান থেকে বেড়ে গত ২৯ জুন ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। গত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আরও বেড়ে হয় ৩৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। তা আবার কমে গতকাল ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
- বিষয় :
- রপ্তানি