ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকারে সাব্বির হাসান নাসির

স্বপ্ন এখন পরিচালন মুনাফায়

স্বপ্ন এখন পরিচালন মুনাফায়
×

সাব্বির হাসান নাসির

--

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২২ | ০১:৩৩

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী এসিআই গ্রুপের কোম্পানি এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির। স্বপ্নর সাম্প্রতিক অগ্রগতি, চেইন সুপারশপ খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ আবদুল্লাহ

সমকাল: সাম্প্রতিক সময়ে স্বপ্ন নতুন নতুন আউটলেট খুলছে। কোন পরিস্থিতি আপনাদের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করছে?

সাব্বির হাসান: ছয় বছর ধরে চেইন সুপারশপ খাতে স্বপ্ন দেশে এক নম্বর ব্র্যান্ড। ফলে এখন একটি ব্র্যান্ড পাওয়ার তৈরি হয়েছে। এ অবস্থান কোম্পানির সম্প্রসারণে আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা ঠিক করেছি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাড়ির কাছেই স্বপ্নর আউটলেট থাকবে। এ চিন্তা থেকেই 'স্বপ্ন এক্সপ্রেস আউটলেট'-এর জন্ম।

সমকাল: এক্সপ্রেস আউটলেট সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।

সাব্বির হাসান: আমরা ছোট পরিসরে দ্রুত এক্সপ্রেস আউটলেট খুলছি। যেখানে সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই আউটলেট স্থাপন করা হচ্ছে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে নতুন আউটলেট হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সারাদেশে ২০০টি আউটলেট খোলা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৪৫ হাজার মানুষ স্বপ্নর আউটলেটগুলোতে কেনাকাটা করছেন। সাপ্তাহিক ছুটির মতো বিশেষ দিনে ৭৫ হাজার মানুষ কেনাকাটা করেন।

সমকাল: কাদের সঙ্গে ফ্যাঞ্চাইজি করছেন?

সাব্বির হাসান: অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বেসরকারি খাত থেকে চাকরি হারিয়েছেন বা ছেড়েছেন, নিজ ব্যবসায় ভালো করতে পারছেন না, বিদেশ ফেরত- এমন লোকদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে স্বপ্নর আউটলেট খোলা হচ্ছে। এতে নিজস্ব বিনিয়োগ কম লাগছে।

সমকাল: স্বপ্ন কিছুদিন ধরে মুনাফা করছে বলে আমরা শুনেছি। ২০২১ সালের আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই।

সাব্বির হাসান: হ্যাঁ, গত বছরে এপ্রিল-জুন এবং জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে আমাদের পরিচালন মুনাফা হয়েছে। আশা করছি, শেষ ত্রৈমাসিকেও (অক্টোবর-ডিসেম্বর) পরিচালন মুনাফা হবে। নিট মুনাফায় আসতে একটু সময় লাগবে। এর অন্যতম কারণ অর্থায়নের খরচ। আমাদের বিনিয়োগ ও ঋণের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে গুণোত্তর হারে সুদের চাপ বাড়তে থাকে। সম্প্রতি আমাদের নিট লোকসান উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং কমছে। এ ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ একটা বড় ভূমিকা রেখেছে।

সমকাল: স্বপ্নর আর কোনো নতুন পরিকল্পনা আছে?

সাব্বির হাসান: স্বপ্ন সবসময়ই চায় মানুষ যাতে একটি আউটলেট থেকেই তার প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে নিতে পারেন। সেজন্য আরও পণ্য সংযোজন করাই আমাদের পরিকল্পনা। বলতে পারেন অসংখ্য পণ্য সংযোজনের অপেক্ষায় আছে। বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নতুন পণ্য সংযোজন করা হচ্ছে। আমরা দেখছি মানুষ রেডি ফুড চাচ্ছে। আবার কিছু পণ্যে ক্রেতারা সন্তুষ্ট নন। সে ক্ষেত্রে নিজস্ব পণ্য আনার চেষ্টা রয়েছে।

সমকাল: করোনার সময়ে সুপারস্টোরে কেনাকাটায় ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি ছিল। সংক্রমণ কমে যাওয়ার পরের পরিস্থিতি কেমন?

সাব্বির হাসান: সার্বিকভাবে বেড়েছে। এর কারণ ছিল নিরাপদ ও কম সময়ে কেনাকাটা করার সুযোগ। এ ছাড়া হোম ডেলিভারি সুবিধা, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অর্ডার, ডিসকাউন্ট, স্যানিটাইজার, ফ্লোরে মার্কিং করে দূরত্ব বজায় রাখার মতো করোনা প্রতিরোধী ব্যবস্থার কারণে মানুষ মনে করেছে সুপারশপ নিরাপদ। কিন্তু এখন আবার অনেকে খোলা বাজারে ফিরে গেছেন। তাতে অবশ্য স্বপ্নর অসুবিধা বিশেষ হয়নি। কারণ, নতুন নতুন আউটলেট, প্রচুর পণ্যের সমারোহ, সহজে পণ্য সংগ্রহ করতে পারার কারণে স্বপ্নর ক্রেতা ধরে রাখা সহজ হয়েছে।

সমকাল: সুপার মার্কেটের সম্প্রসারণে কী ধরনের রাষ্ট্রীয় নীতি দরকার?

সাব্বির হাসান: দেশে নিত্যপণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। বলা হয়ে থাকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের মার্কেট। একে করের আওতায় আনতে হলে আধুনিক বাজার ব্যবস্থায় যেতে হবে। কিন্তু নীতি যা করা হয়, তা আধুনিক বাজার ব্যবস্থাকে সহায়তা করে না। সুপারশপে সরকার সেলস ভ্যাট বসিয়েছে, যা অনেক খুচরা দোকানে বসানো হয়নি। এই অসম নীতি পরিবর্তন করতে হবে। এই ভ্যাট এমআরপির ভেতর অন্তর্ভুক্ত করে দিলে এর সমাধান হতে পারে। এ ছাড়া এ খাতের জন্য সহজ শর্তে একটি দীর্ঘমেয়াদি যথার্থ অর্থায়ন ব্যবস্থা থাকা দরকার।

সমকাল: আপনাদের আউটলেটে পণ্যের মান কীভাবে বজায় রাখেন?

সাব্বির হাসান: আমাদের অধিকাংশ পণ্য বিভিন্ন নামকরা কোম্পানির, যার কিছু দেশে উৎপাদিত, কিছু আমদানি করা। এ ধরনের পণ্যের মানের জন্য আমরা সংশ্নিষ্ট কোম্পানি ও বিএসটিআইর ওপর নির্ভর করি। আমরা ক্রেতাদের পণ্যগুলো এক জায়গায় করে দিচ্ছি। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ফেরতের ব্যবস্থা করছি। এ ছাড়া স্বপ্ন নিজস্ব যেসব পণ্য আউটলেটে সরবরাহ করছে, সেগুলোর মান স্বপ্নর নিজস্ব ল্যাবরেটরি ও বিএসটিআইর ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। মাছ, মাংস, সবজি নিজস্ব ল্যাবেই পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।

সমকাল: স্বপ্নর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলবেন?

সাব্বির হাসান: আগামী ১০ বছরে সারাদেশে দুই থেকে তিন হাজার আউটলেট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট মুনাফা অর্জন করতে চাই। ২০৩০ সালে স্বপ্ন হবে এক বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি। সরবরাহ ব্যবস্থার ৭০ শতাংশ প্রান্তিক কৃষকনির্ভর হবে। বর্তমানে যা ২৩ শতাংশ।

সমকাল: আপনারা কৃষকের সঙ্গে কীভাবে কাজ করছেন?

সাব্বির হাসান: সারাদেশে দুই হাজারের বেশি কৃষকের স্বপ্নর সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। এসব কৃষক থেকে সরাসরি পণ্য কেনা হয়। স্বপ্নর নীতিমালা অনুযায়ী, চাষ ও ফসল উত্তোলন করেন তারা। এ জন্য তাদের পণ্যের দাম বাজারের তুলনায় বেশি দেওয়া হয়। সবচেয়ে ইতিবাচক হচ্ছে- পণ্য নিয়ে তাদের ক্রেতার কাছে যেতে হয় না, আমরা তাদের কাছে যাই। আমরা কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহার, ব্যবহারের কতদিন পর ফসল তোলা উচিত- এসব বিষয়ে ধারণা দিয়ে থাকি, যাতে এ ফসল নিরাপদ খাদ্যের জোগান দিতে পারে।

সমকাল: সাম্প্রতিক সময়ে স্বপ্নর বিশেষ অর্জন কী?

সাব্বির হাসান: ২০২০ সালে এশিয়ান মার্কেটিং ফেডারেশন স্বপ্নকে এশিয়ার সেরা মার্কেটিং কোম্পানি হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এশিয়ার ১৭টি দেশের শীর্ষ বিপণন কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে স্বপ্ন এটি অর্জন করেছে। এতে বিপণন কৌশল, ব্র্যান্ডের গতিবিধি, উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন বিষয়ে চুলচেরা বিশ্নেষণ করেছে জুরি বোর্ড। স্বপ্ন দেখিয়েছে বিভিন্ন সেক্টরের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব। সামাজিক দূরত্বের আড়ালে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছিল। স্বপ্নর 'ফোনে ফোনে বাজার'- মানসিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকার একটা সহায়ক উদ্ভাবন।

আরও পড়ুন

×