ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

ভোটারের আস্থা ফেরানো জরুরি

ভোটারের আস্থা ফেরানো জরুরি
×

এমাজউদ্দীন আহমদ

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৩৭

শনিবার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যে নির্বাচন হয়ে গেল, তাও প্রশ্নবিদ্ধ হলো। এই নির্বাচন নিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে শঙ্কার দাগটাই বেশি মোটা হয়ে উঠেছিল এবং বাস্তবে এরই প্রতিফলন দেখ গেল। নানা মহল থেকে এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনসহ তাদের সব সহযোগী শক্তিকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়ে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলেও নির্বাচনের মূল কাঠামো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন আবারও ব্যর্থতার যে স্বাক্ষর রাখল, তা আগামী দিনের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য শুভপ্রদ নয়।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই মেয়র পদে নির্বাচিত হলেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদ্বয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কথায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ভোটদাতার সংখ্যা ২৫ শতাংশের কিছু বেশি। আর দক্ষিণে ২৯ শতাংশ। কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে এত কম সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। আজকে আমরা যে বিবর্ণ অবস্থানে রয়েছি, তার জন্য তথাকথিত এই গণতন্ত্রই দায়ী। কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এক উপনির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ২২ শতাংশের মতো। এই অবস্থার সৃষ্টি হলো কেন? সমাজব্যাপী যেন অগণতান্ত্রিকতা চেপে বসেছে। অথচ ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশের এ অঞ্চলে গণতান্ত্রিক আদর্শ বরাবরই ছিল প্রেরণার উৎস।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বরাবরই জনগণের, বিশেষ করে এ অঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। গণতন্ত্রের জন্য এ দেশের জনগণ সংগ্রাম করেছে, এখনও করছে। রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে কিছু অর্জনও করেছে। গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা নির্বাচনের রায়কে লঙ্ঘন করে পাকিস্তানি বলদর্পীরা ১৯৭০ সালে যে নোংরা ষড়যন্ত্র করেছিল, সেটাই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ। সীমাহীন ত্যাগের মাধ্যমে, অকল্পনীয় তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক হতে পেরেছি। তাই এখনকার নির্বাচনে বাংলার জীবন্ত মানুষদের প্রচণ্ডভাবে অবহেলা সর্বমহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। নির্বাচনের এই পরিণতি কি বলে দিচ্ছে যে, এটা নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের অনাস্থা? অথবা ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার প্রতি সীমাহীন দুর্বলতা? নাকি নির্বাচনের প্রতি জনগণের উদাসীনতা? যাই হোক, এ বিষয়ে গভীর ভাবনাচিন্তা দরকার, প্রচুর গবেষণা প্রয়োজন।

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কতটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। নির্বাচনে হারজিত খুব স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এই হারজিতটা যদি নির্ধারিত হয় প্রশ্নমুক্ত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার সড়ক ধরে, তাহলে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ কম থাকে। এ বিষয়গুলো যে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা জানেন না কিংবা বুঝেন না, তা তো নয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের ওপর জনআস্থা ধ্বংস হওয়ার যে উদ্বেগজনক বার্তা ক্রমেই পুষ্ট হচ্ছে, তা কোনোভাবেই স্বস্তির বিষয় নয়।

বাংলাদেশের মানুষ তুলনামূলকভাবে অনেক রাজনীতি-সচেতন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জনমনে হঠাৎ এমন উদাসীনতা কীভাবে জন্মলাভ করল? ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে যে জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল, সেই নির্বাচন বাংলার মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছে। ৩০ ডিসেম্বরের ভোট কীভাবে ২৯ ডিসেম্বর রাতেই সম্পন্ন হয়েছিল, তা ইতিহাসের কদর্য অধ্যায়। তখনও এই নির্বাচন কমিশনই দায়িত্বরত ছিল। তারও আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে জাতীয় নির্বাচন হয়, তাতে ১৫৪ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় সংসদের সদস্য হলেন। শপথ গ্রহণের সময় নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে তাদের কোনো একজনকেও বিব্রতবোধ করতে দেখিনি। এ বছর ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জনগণের যে অনাস্থা পরিলক্ষিত হলো, তা কি এসব কারণে? যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন প্রক্রিয়া হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের মহাসড়কে ওঠার প্রকৃষ্ট পন্থা হিসেবে এর কোনো বিকল্প নেই। সর্বত্রই নির্বাচনী ব্যবস্থা এমনি হয়- যেখানে জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। এই নির্বাচনে সব দল-মতের প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। এ জন্যই মূলত নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ ও জনসাধারণের কাছে আকর্ষণীয়।

আজকের জনগণ নির্বাচন সম্পর্কে কেন এত উদাসীন- এই প্রশ্নটিই যেন বারবার উঠছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের অর্জন মন্দ নয়। যদিও সমাজের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের ফল প্রসারিত হচ্ছে না। এরপরও সরকার অভিনন্দন পেতে পারে। কিন্তু উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে হলে দরকার স্থিতিশীল গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের মাধ্যমেই সমাজের বিভিন্ন স্তরে উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়ে। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ক্ষমতাসীন দল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি যতটুকু মোহগ্রস্ত, গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে ঠিক ততটুকুই উদাসীন। অনেকের মতে, ক্ষমতাসীন দল এবং গণতন্ত্র একসঙ্গে যায় না। এ জন্যই কি শনিবারের ঢাকা সিটির নির্বাচনে হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করতে হয়েছে জনগণের এমন ঔদাসীন্য? নির্বাচন কমিশনের অন্তর্দ্বন্দ্বই হোক কিংবা দুর্বলতাই হোক- নিঃসন্দেহে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। জাতীয় স্বার্থে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নির্বাচন সম্পর্কে জনগণের এমন অনাগ্রহ এবং সরকারের ক্ষমতাপ্রিয় মানসিকতায় দেশ কি একদলীয় ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? এ বিষয়েও গভীর চিন্তাভাবনার প্রয়োজন।

গণতন্ত্রে ভোট বা নির্বাচন মানে উৎসব। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তা কবেই যেন হারিয়ে গেছে। এখন যা লক্ষ্য করছি তা হচ্ছে- চিত্র ক্রমেই বিবর্ণ থেকে হচ্ছে বিবর্ণতর। কেন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কিংবা সরকার ব্যবস্থার অন্যতম অনুষঙ্গ নির্বাচনে উৎসবের রূপ হারিয়ে গেল, প্রশ্নের উত্তরটা সচেতন মানুষমাত্রেরই জানা। ঢাকা সিটি নির্বাচনে নগণ্য সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি ভোট কিংবা নির্বাচনের প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশই নয়, নির্বাচন কমিশন, সরকারসহ সংশ্নিষ্ট সব দায়িত্বশীল মহলের জন্যই এটি একটি সতর্কবার্তা বলেও মনে করি। সরকারের এই যে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড কিংবা অর্জনের কথা বললাম, এসব কোনো কিছুই টেকসই হবে না, যদি নির্বাচনের প্রতি জনআস্থা ফিরে না আসে। এবার ঢাকা সিটি নির্বাচনে ইভিএমে সব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের ব্যাপারে নানা মহলের আপত্তি ছিল। এর কারণও সুনির্দিষ্ট করে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তা আমলেই নেয়নি। ইভিএম বিড়ম্বনাসহ এ ব্যাপারে আরও কিছু নেতিবাচক চিত্র এই নির্বাচনেই ফুটে উঠল।

আমাদের সরকার গণতন্ত্র নিয়ে এত কথা বলছে, কিন্তু বাস্তবে আমরা কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছি, এরই নজির ফের মিলল ঢাকা সিটি নির্বাচনে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করাটা নির্বাচন কমিশনের হূত আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্যই শুধু জরুরি ছিল না, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্যও ছিল অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকারের ভাবমূর্তিও ফের প্রশ্নবিদ্ধ হলো। ভোটারদের কেন্দ্রমুখী হওয়ার পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতা বিরাজ করছিল, সেসব বিষয়ের নিরসন দায়িত্বশীলরা করতে পারেননি। 'এমন নির্বাচন চাইনি'- সিইসির এই বক্তব্যের মাঝেই উত্থাপিত অনেক প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে। প্রচারাভিযান চলাকালে বিরোধীপক্ষের নানারকম ওজর-আপত্তির নিষ্পত্তিও নির্বাচন কমিশন করতে পারেনি। যারা উন্নত দেশের ভোটের হারের তুলনা করে নগণ্য সংখ্যক ভোটারের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে নিস্কৃতি পেতে চেয়েছেন, তাদের স্মরণে রাখা উচিত- ওই সব দেশের সঙ্গে আমাদের তুলনা কোনোভাবেই চলে না। নির্বাচন কিংবা ভোট ব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কার দানা ক্রমেই যেভাবে পুষ্ট হচ্ছে, প্রশ্নের তালিকা যেভাবে দীর্ঘ হয়েই চলেছে, এমনটি নিঃসন্দেহে তা অশুভ বার্তা। আমাদের দায়িত্বশীলরা যেন এও ভুলে না যান যে- সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের শর্ত কেবল সবার অংশগ্রহণই নয়, এর জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিষয়টিও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। অসমতল মাঠে কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন সম্পন্নকরণ দুরূহ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×