ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল

লোকসানের হেতু কী

লোকসানের হেতু কী
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৯ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৯

বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া যেইভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাঁচতারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল বৃহদাকার লোকসান গুনিতেছে, উহা বিস্ময়কর বটে। আরও বিস্ময়কর, হোটেলটি দীর্ঘ ১০ বৎসর যাবৎ লোকসানে রহিলেও পরিচালনা পর্ষদ ও অর্থ বিভাগ দেনা পরিশোধেই দায় সম্পাদন করিয়া চলিয়াছে। গত বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পর সম্প্রতি সরকার হোটেলটির প্রায় ৯ শত কোটি টাকার দেনা পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। প্রশ্ন হইল, এই সিদ্ধান্ত কি দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান আনিতে পারিবে? যেইখানে বেসরকারি খাতের পাঁচতারকা হোটেলগুলি শতকোটি টাকার অধিক মুনাফা করিয়াছে, সেইখানে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের এইরূপ করুণ দশা কেন?

আমরা জানি, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপের সহিত ২০১২ সালে ৩০ বছর মেয়াদি হোটেল পরিচালনা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’ পরিচালিত হইতেছে। চুক্তির শর্তানুসারে, ইন্টারকন্টিনেন্টালের ব্র্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অর্জনের জন্য মূল অবকাঠামো অক্ষুণ্ন রাখিয়া ভৌত, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল, সাজসজ্জাসহ সকল প্রকার আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রতিস্থাপনে ২০১৫ হইতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সংস্কার হয়। সংস্কারকর্মের জন্য অগ্রণী ব্যাংক হইতে ৫৭৪ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ঋণ লইলেও ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নূতন করিয়া চালু হইবার পরও হোটেলটি আর মুনাফা করিতে পারে নাই। আর লোকসানে থাকিবার কারণে তাহারা ঋণও পরিশোধ করিতে ব্যর্থ হয়। প্রশ্ন হইল, নিছক আর্থিক পুনর্গঠন বা দেনা পরিশোধ করিয়া রাষ্ট্রায়ত্ত এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের টিকিয়া থাকা সম্ভব হইবে কি? 

আমরা মনে করি, আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে বিলাসবহুল আন্তর্জাতিক মানের হোটেল পরিচালনা করিবার নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাই এই লোকসানের মূল কারণ। সেই কারণে হোটেলটিতে পরিচালনা পর্ষদ ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় সরকারি হস্তক্ষেপ হ্রাস করিয়া বেসরকারি খাতের দক্ষ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করা উচিত। আমরা দেখিয়াছি, অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই সরকারের উপর আর্থিক চাপ তৈয়ার করিতেছে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের পরিস্থিতি অনুধাবন করিয়া অনেক পূর্বেই উহা বেসরকারি খাতে ছাড়িয়া দেওয়া উচিত ছিল। সরকারি পর্যায়ে এই সকল পরিচালনার অভিজ্ঞতা লোকসান বিনা কিছু নহে। সরকারের আর্থিক বিষয় দেখিবার জন্য সরকারের একজন প্রতিনিধি বোর্ডে থাকিতে পারেন বটে। কিন্তু পরিচালনা বেসরকারি খাতে দিয়া ব্যবসা-সংক্রান্ত বিষয়ে বেসরকারি খাতের যাহারা হোটেল পরিচালনায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ, তাহাদের লইয়া আসিবার বিকল্প নাই।

সত্য যে, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সহিত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত। ১৯৬৬ সালে ইহা প্রথম ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা নামে চালু হইলেও স্বাধীনতার পর ১৯৮৩ সালে হোটেল শেরাটন এবং ইহার পর হোটেল রূপসী বাংলা নামে পরিচালিত হয়। দীর্ঘ সময় পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ইহা পুনরায় ইন্টারকন্টিনেন্টাল হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বমানের সেবা লইয়া ফিরিয়া আসে। তখনও ভাবা হইয়াছিল, হোটেলটি বুঝি মুনাফার মুখ দর্শন করি। কিন্তু উহার পর সাত বৎসর অতিক্রম করিলেও সেই আশায় গুড়েবালি।

আমরা মনে করি, ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক মানের হোটেলটিতে কেন বৎসরের পর বৎসর লোকসানের ধারা চলমান, উহার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। তজ্জন্য ইহার পরিচালনা পর্ষদের নিকট লোকসানের স্পষ্ট জবাবদিহি চাহিবার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অন্যেরা যখন মুনাফা করিতেছে তখন এহেন লোকসান আর চলিতে দেওয়া যায় না। সরকারের উপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈয়ার না করিয়া হোটেলকে নিজস্ব আয়ে টেকসই ও লাভজনক করার সুনির্দিষ্ট পথনকশা প্রণয়ন করিতে হইবে। অন্যথায় ইহাকে বেসরকারি খাতে ছাড়িয়া দেওয়াই হইবে বুদ্ধিমানের কাজ।

আরও পড়ুন

×