ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

অভাব হার মানাতে পারেনি চা দোকানির সন্তানদের

অভাব হার মানাতে পারেনি চা দোকানির সন্তানদের
×
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১৯:৫১ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ১৯:৫২

ভোরে চায়ের দোকান খোলা, গভীর রাতে বন্ধ করা। দীর্ঘ কর্মঘণ্টার আয়েই চলে সংসার, মেটে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ। সীমিত সামর্থ্য, অভাব আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের স্বপ্ন পূরণে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন তাঁরা। সেই পরিশ্রমের স্বীকৃতি পেয়েছেন চায়ের দোকানি বাবা-মায়েরা। তাঁদের এমন ১৩৫ জন মেধাবী সন্তান এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।

এসব শিক্ষার্থী ও তাঁদের বাবা-মাকে গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীতে সংবর্ধনা দিয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ব্র্যান্ড নাম্বার ওয়ান। ‘নাম্বার ওয়ান বাবার কৃতী সন্তান সংবর্ধনা ২০২৬’ শীর্ষক এ আয়োজনে শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের শ্রম ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদেরও সম্মানিত করা হয়।

অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রেস্ট, সনদ, বৃত্তির অর্থ ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি নাম্বার ওয়ানের সহযোগিতায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে টেন মিনিট স্কুলের দুই বছরের একাডেমিক কোর্স করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

এক বই ভাগ করে পড়েছেন দুই বোন

চাঁদপুরের রূপসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের যমজ বোন আমেনা আক্তার ও আফসানা আক্তার। মাধ্যমিকের পড়াশোনার দিনগুলোতে তাঁদের একটি বই ভাগাভাগি করে পড়তে হয়েছে। তাঁদের বাবা আবদুল আজিজ চাঁদপুরে আজাদ সুপার শপ নামে একটি চায়ের দোকান চালান। সেই দোকানের আয় দিয়েই চার ভাইবোনের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাতে হয়েছে তাঁকে।

আমেনা বলেন, ‘দেখা যেত, আমার একটা বিষয় পড়তে হবে, কিন্তু ওই বইটা আমার বোন আফসানা পড়ছে। বই একটা হওয়ায় আমাদের মধ্যে মাঝেমধ্যে ঝগড়া হতো।’

একটি বই ভাগ করে পড়লেও পড়াশোনা নিয়ে দুই বোনের লক্ষ্য একই। দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়তে চান। উচ্চশিক্ষা শেষে বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা তাঁদের। আফসানা বলেন, ‘আমরা দুজনই শিক্ষা ক্যাডারে যেতে চাই। শিক্ষকতার মধ্যে একটা তৃপ্তি আছে।’

মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করে নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে দেখতে চান বাবা আবদুল আজিজও। তিনি বলেন, ‘আমার ইচ্ছা, মেয়েরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করুক। আমি জানি, একদিন আমার মেয়েরাই আমাকে গর্বিত বাবা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার সুযোগ করে দেবে।’

চিকিৎসক হতে চায় দিয়া

কক্সবাজারের বায়তুশ শরফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া চৌধুরীর বাবা লিটন চৌধুরী। তিনি পুষ্প স্টোর ২ নামে একটি চায়ের দোকান চালান। দোকানের আয় থেকেই মেয়ের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন তিনি।

দিয়া বলেন, ‘বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অনেকে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, আমি হয়তো পাস করতে পারব না। কিন্তু বাবা-মা সব সময় আমাকে সাহস দিয়েছেন। তাঁদের সমর্থন না থাকলে আমি কখনোই এই ফল করতে পারতাম না।’

বর্তমানে কক্সবাজারের একটি কলেজে পড়ছেন দিয়া। ভবিষ্যতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে চিকিৎসক হতে চান তিনি। মেয়ের স্বপ্ন পূরণে পাশে থাকতে চান তাঁর বাবা-মাও।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দিয়া বলেন, ‘নাম্বার ওয়ানের সহযোগিতায় টেন মিনিট স্কুলের যে দুই বছরের কোর্স করার সুযোগ পাচ্ছি, তা এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করতে সাহায্য করবে বলে আশা করি। আমি ভালো ফলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে চাই এবং চিকিৎসক হয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’

বাবার স্বপ্ন, চিকিৎসক হোক মেয়ে

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফটকের পাশে চায়ের দোকান চালান শৈবী চাকমার বাবা শান্তি লাল চাকমা। দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচও জোগাতে হয় তাঁকে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

শান্তি লাল চাকমা বলেন, ‘আমি চাই, আমার মেয়ে ভালো ফলাফল করে চিকিৎসক হোক এবং আমার স্বপ্ন পূরণ করুক। আমি যে হাসপাতালের সামনে চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালাই, একদিন সেই হাসপাতালেই যদি আমার মেয়ে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করে, তাহলে আমি গর্ব করে বলতে পারব, আমি একজন চায়ের দোকানি, আর আমার মেয়ে এই হাসপাতালের চিকিৎসক। মেয়েকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। আমি চাই, সে উচ্চশিক্ষিত হয়ে মানুষের সেবা করুক।’

বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চায় শৈবীও। খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা শুরু করেছে সে। তার লক্ষ্য, এইচএসসিতে ভালো ফল করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার সুযোগ পাওয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায় মামুন

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে আশরাফুল টি স্টল চালান আল মামুনের বাবা দুলাল হোসেন। সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসার প্রয়োজন মেটাতে অনেক সময় ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে হয়েছে তাঁকে।

ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেখতে চান দুলাল হোসেন। তাঁর আশা, ছেলে ভালো ফলের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে এবং নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাবে।

মামুনও বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে এখন থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী হতে চায় সে। বাবার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের মর্যাদা দিতে ভালো ফল ধরে রাখাই তার লক্ষ্য।

মামুন, দিয়া, শৈবী, আমেনা ও আফসানার মতো চায়ের দোকানি বাবা-মায়ের অন্য সন্তানদেরও রয়েছে নানা স্বপ্ন। তাঁদের সেই স্বপ্ন পূরণের পথে পাশে থাকতে এবং উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে উৎসাহ দিতে গত তিন বছর ধরে এ আয়োজন করে আসছে নাম্বার ওয়ান।

স্বপ্ন দেখতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে

‘নাম্বার ওয়ান বাবার কৃতী সন্তান সংবর্ধনা ২০২৬’ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক এবং টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আয়মান সাদিক।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আনিসুল হক বলেন, ‘জীবনে বড় হওয়ার জন্য শুধু ভালো ফল করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্বপ্ন দেখা, পরিশ্রম করা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস।’

পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা যেন শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেই প্রত্যাশাও জানান তিনি।

আয়মান সাদিক শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে নিজেদের মেধার পরিচয় দিয়েছ। এবার এই অর্জনকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে হবে।’

নাম্বার ওয়ানের সহযোগিতায় দেওয়া টেন মিনিট স্কুলের কোর্সগুলো শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা, পরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং নিজেদের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখতে সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়মান সাদিক।

অনুষ্ঠানে এমজিআইয়ের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. রহমতুল্লাহ খোন্দকার, চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার আতিক উজ জামান খান, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (অডিট) সাজ্জাদ হোসেন, ডিজিএম (ব্র্যান্ড) মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, এজিএম অর্জুন চন্দ্র নাথ, আব্দুর রহিম শেখ এবং রতন মজুমদার।

এ আয়োজন সম্পর্কে এমজিআইয়ের চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. রহমতুল্লাহ খোন্দকার বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি পেলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বপ্ন পূরণে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত বাবা-মায়ের সন্তানদের এই সাফল্য তাঁদের পরিবারের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও ত্যাগের ফল। নাম্বার ওয়ানের এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাঁদের বাবা-মায়ের অবদানকে সম্মান জানাতে চাই। শিক্ষার্থীরা যেন আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পড়াশোনার পথে পিছিয়ে না পড়ে, সে লক্ষ্যে আমরা তাঁদের পাশে থাকতে চাই। ভবিষ্যতেও এই উদ্যোগ অব্যাহত রেখে আরও শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করা এবং তাঁদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করাই আমাদের লক্ষ্য।’

আরও পড়ুন

×