ছুটি শেষে অফিসে এসে দেখেন ১০০ মিলিয়ন ডলার লুট
‘স্টোলেন: হাইস্ট অব দ্য সেঞ্চুরি’ রিভিউ
শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ডাকাতির ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে পর্দায়। ছবি: সংগৃহীত
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ১৪:১৬ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ১৮:২১
২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারির এক শীতের রাত। সাপ্তাহিক ছুটির কারণে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প শহরে তখন নিস্তব্ধতা। স্বাভাবিকভাবেই পরদিন অফিসে এসেছিলেন শহরের ডায়মন্ড সেন্টারের কর্মীরা। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীরা ভল্ট চেক করে যে খবর দেন, তা শুনে মুহুর্তেই পথে বসেন শতাধিক ব্যবসায়ী।
ডায়মন্ড সেন্টারের ভল্টকে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ভল্টগুলোর একটি বিবেচনা করা হতো। ভেতরে হীরা, স্বার্ণালঙ্কারসহ যাবতীয় সামগ্রীর বাজার মূল্য ছিল প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সুরক্ষায় ছিল পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেগুলো লুট করে চার ডাকাত। শতাব্দীর সবচেয়ে বড় এই ডাকাতির ঘটনা ‘স্টোলেন: হাইস্ট অব দ্য সেঞ্চুরি’ শিরোনামে দুই দশক পর পর্দায় ফিরিয়ে এনেছে নেটফ্লিক্স।
অপরাধীর মুখে সত্য কাহিনি
ডকুমেন্টারিটির মূল আকর্ষণ হলেন এর কেন্দ্রীয় চরিত্র লিওনার্দো নোটারবার্তোলো। যিনি এই ডাকাতির মাস্টারমাইন্ড। সাজাভোগ শেষে মুক্তি পেয়েছেন। নেটফ্লিক্সের এই ডকুমেন্টারিতেই তিনি প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে কথা বলেছেন। লিওনার্দোর বর্ণনায় উঠে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে ডাকাতির খুঁটিনাটি।
ডায়মন্ড সেন্টারের ভল্ট ছিল এক আধুনিক দুর্গ। ইনফ্রারেড সেন্সর, মোশন ডিটেক্টর, সিসিটিভি নজরদারি, স্টিল ডোর- সবই ছিল সেখানে। মূলত ডায়মন্ড সেন্টারের ব্যবসায়ীরা এই ভল্টে তাদের মূল্যবান সামগ্রী রাখতেন। কেবল তারাই সেখানে প্রবেশের অনুমতি পেতেন। এই সেন্টারে কাউকে ব্যবসা করার অনুমতিও দেওয়া হতো নানা ধরনের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর। ডাকাতির দুই বছর আগে এই সেন্টারে হীরা ব্যবসায়ী হিসেবে নিবন্ধন নেন লিওনার্দো। নিজেকে ইতালীর ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দেন। থাকতেন ডায়মন্ড সেন্টারের পাশের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে।
ডকুমেন্টারিতে লিওনার্দোর বর্ণনায় উঠে এসেছে, প্রবেশের অনুমতি থাকায় তিনি ভেতরের পরিবেশ নিজ চোখে দেখার সুযোগ পেতেন। কোনো পরিবর্তনও নজরে আসতো। এসব দেখে মাসের পর পর নিজ বাসায় একটি রেপ্লিকা ভল্ট তৈরি করেন। ওই রেপ্লিকা ভল্টেই মালামাল সরানোর মহড়া দিতেন।
_1755418498.jpg)
ডকুমেন্টারির একটি দৃশ্যে লিওনার্দোকে জিজ্ঞেস করা হয়, এমন ডাকাতি নিয়ে তাঁর কোনো অপরাধবোধ আছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, একটুও নেই। কারণ ইন্স্যুরেন্সের নিয়ম থাকায় ক্ষতিগ্রস্তরা পুরোপুরি ক্ষতির মুখে পড়বে না। ১০ ডলার চুরি হলে তারা ২০ ডলারের কথা প্রচার করে অর্থ দাবি কিংবা সহায়তা নেবে।
নিখুঁক কৌশল, ছোট্ট বোকামি
ভল্টের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সক্রিয় থাকা অবস্থায় কেউ সেখানে প্রবেশ করলে তাপমাত্রা ও আলোর পরিবর্তন হতো। সঙ্গে সঙ্গেই বেজে উঠতো সতর্কতার সংকেত। কিন্তু এসব নিরাপত্তা ভেদ করতে লিওনার্দো তাঁর দলে আরও কয়েকজনকে যুক্ত করেন। যারা নকল চাবি তৈরি, সিসি ক্যামেরা ও লকারের ইউনিক পাসওয়ার্ড হ্যাকে পারদর্শী। কিন্তু ভল্টের নিরাপত্তা ছেদ করতে তারা খুবই সাধারণ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। যেমন, লাইট সেন্সর টেপ দিয়ে ঢেকে ও তাপমাত্রার সেন্সরে করেছিলেন হেয়ার স্প্রে। এতে সেন্সরগুলো সক্রিয় থাকলেও বাইরের কারও উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারেনি। এই সাধারণ কাজগুলোই এতটা নিখুঁত ছিল যে তদন্তকারীরাও পরে হতবাক হয়ে যান।
২০০৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাত ছিল লিওনার্দোর জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। সফলভাবে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ মূল্যের হীরা, সোনা ও মূল্যবান রত্ন লুট করে নিরাপদে বাসায় ফিরেছিলেন। উদযাপনও ছিল বেশ সাদামাটা। ওয়াইনের সঙ্গে খেয়েছিলেন স্যান্ডউইচ। উধাও হওয়ার আগে এসব খাবার কেনার রশিদ, নিজের ও লুটের কাজে ব্যবহৃত কিছু সামগ্রী ময়লার ব্যাগে ভর্তি করে কয়েক কিলোমিটর দূরের এক বনের ভেতর ফেলে দেন। এই ময়লার ব্যাগই কাল হয় লিওনার্দো ও তাঁর সহযোগীদের।
সিনেমাটিক ছোঁয়া
নেটফ্লিক্সের ডকুমেন্টারিটি নিছক তদন্তভিত্তিক কোনো গল্প নয়। জর্জ ক্লুনি, জুলিয়া রবার্টস, ম্যাট ডেমন ও ব্রড পিটের ‘ওশেন’স ইলাভেন’ সিনেমার স্বাদ পাবেন এতে। ‘দ্য ইউজুয়াল সাসপেক্টস’ এর আবহও তৈরি করার চেষ্টা করেছেন পরিচালক। এ কারণে ডকুমেন্টারি দেখার সময়ও হেইস্ট ঘরনার সিনেমার নাটকীয়তার স্বাদ পাওয়া যায়।
তবে বেলজিয়ামের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ডকুমেন্টারির কিছু বিষয়কে অতিরঞ্জিত বলা হয়েছে। মাস্টারমাইন্ড লিওনার্দো কিছু ক্ষেত্রে নিজের কৌশলকে অতিরঞ্জিত করে বর্ণনা করেছেন। ডকুমেন্টারিতে এমন বিষয়গুলো রাখায় কিছু দৃশ্যে নাটকীয়তা যোগ হলেও তা বাস্তবতা বিবর্জিত হয়েছে।
- বিষয় :
- ডাকাতি
- হীরা
- নেটফ্লিক্স
- ওটিটি প্লাটফর্ম
