ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রিভিউ

লিভ দ্য ওয়ার্ল্ড বিহাইন্ড: মহাপ্রলয় নয়, একটি বিপর্যয়ের ইঙ্গিত

লিভ দ্য ওয়ার্ল্ড বিহাইন্ড: মহাপ্রলয় নয়, একটি বিপর্যয়ের ইঙ্গিত
×

লিভ দ্য ওয়ার্ল্ড বিহাইন্ড সিনেমার একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:৫৩

জুলিয়া রবার্টস অভিনীত ‘লিভ দ্য ওয়ার্ল্ড বিহাইন্ড’ প্রচলিত থ্রিলার নয়। আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে মানুষের মানসিকতা কেমন হতে পারে, সেটির এক শীতল ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। 

টিভি সিরিজ ‘মিস্টার রোবট’ এর জন্য বেশি পরিচিত স্যাম ইসমাইল ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির পরিচালক। রুমান আলমের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রটিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রযুক্তির ওপর আমাদের নির্ভরতা এবং আসন্ন বিপর্যয় নিয়ে।

সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে সিনেমাটি দেখার সময় মনে হয়েছে এটি মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের পাশাপাশি অ্যাপোক্যালিপ্স ড্রামার সংমিশ্রণ। যা দর্শককে এক অস্বস্তিকর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।

বিচ্ছিন্নতা এক অজানা শত্রু
নৈরাশ্যবাদী আম্যান্ডা স্যান্ডফোর্ড (জুলিয়া রবার্টস) এক ছুটিতে স্বামী সন্তানদের নিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে দূরের একটি দ্বীপে বেড়াতে যান। ওঠেন বিলাসবহুল একটি ভাড়া বাড়িতে। উদ্দেশ্য ছিল কিছু সময়ের জন্য যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে থাকা। কিন্তু সেই শান্তি হয় স্বল্পস্থায়ী।

এক গভীর রাতে আম্যান্ডার ভাড়া বাড়ির দরজায় কড়া নাড়েন জি এইচ স্কট (মাহেরশালা আলি) ও তাঁর মেয়ে রুথ (মাইহা’লা হারল্ড)। দাবি করেন শহরে ব্ল্যাকআউট চলছে। তাদের আশ্রয় দরকার। কিন্তু আম্যান্ডা তাদের বিশ্বাস করতে দ্বিধায় পড়েন। সাদা চামড়ার মানুষদের পারিবারিক ছুটিতে দুই কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির উপস্থিতি তাঁর মনে শ্রেণি ও বর্ণগত সন্দেহ জাগায়। বাইরে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, টেলিভিশন, জিপিএস- সব ধরণের সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ফলে আম্যান্ডার মনে দানা বাঁধে আরেক অজানা শত্রুর উপস্থিতি।

সিনেমার শুরুর পর দীর্ঘ সময় গল্প ঘুরপাক খায় এই দুই পরিবারকে কেন্দ্র করে। কিন্তু তা যে খুব বেশি একঘেয়ে লাগে এমনটা নয়। লম্বা শট, অপ্রত্যাশিত জুম-ইন এবং ক্যানভাসকে কাত করে ফেলার মতো নির্মাণ কৌশলগুলো দর্শকের মনে এক ধরণের অস্থিরতা ও অজানা বিপদের চাপ সৃষ্টি করে। 

পরিচালক সিনেমায় সরাসরি কোনো খলনায়ক বা চূড়ান্ত ধ্বংসের দৃশ্য না দেখিয়ে বরং নীরবতা, বিচ্ছিন্নতা এবং প্রযুক্তির অনুপস্থিতিকে প্রধান ভয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। চিত্রনাট্যটি ধীরগতির, যা প্রথম দিকে কিছু দর্শকের কাছে বিরক্তির কারণ হতে পারে। তবে এই ধীরগতিই দুটি পরিবারের মধ্যেকার মানবিক দুর্বলতা, পক্ষপাতিত্ব এবং সংঘাতের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। 

ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে সিনেমার সাউন্ড ডিজাইনও। যখন জাহাজগুলো তীরে এসে ধাক্কা মারে, অথবা অদ্ভুত শব্দে বনের হরিণগুলো ভিড় করে, তখন বেজে ওঠা আবহ সংগীত সংঘাত, সংঘর্ষের চেয়েও অনেক বেশি আতঙ্কের মনে হয়।

গুজব, অবিশ্বাস, অস্বীকার
লিভ দ্য ওয়ার্ল্ড বিহাইন্ড সিনেমার মূল বিষয়বস্তু হলো যোগাযোগের পতন এবং সভ্যতার ভঙ্গুরতা। প্রযুক্তিকে আমরা এখনো মুক্তির মাধ্যম মনে করি, কিন্তু এটিও আমাদের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিচালক দেখিয়েছেন, যখন ওয়াই-ফাই এবং মোবাইল ফোন কাজ করা বন্ধ করে, তখন আমরা কতটা অসহায় হয়ে পড়ি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ডিজিটাল যুগে তথ্য এবং সত্যের চেয়ে গুজব ও বিভ্রান্তি কীভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

জুলিয়া রবার্টস তাঁর চরিত্র আম্যান্ডাকে এক জটিল, আত্মকেন্দ্রিক এবং প্রাথমিকভাবে অবিশ্বাসী নারী হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর অভিব্যক্তিগুলো আধুনিক মানুষের উদ্বেগ এবং সহজে বিশ্বাস না করার প্রবণতাকে তুলে ধরে। 

অন্যদিকে, মাহেরশালা আলি জি. এইচ. স্কট চরিত্রে শান্ত ও যুক্তিবাদী মানুষের ভূমিকায় এক দারুণ ভারসাম্য এনেছেন। তাঁর নিস্তব্ধতা যেন আরও বেশি বিপদ সংকেত দেয়। অ্যামান্ডার স্বামী ক্লের চরিত্রে ইথান হক ফুটিয়ে তুলেছেন মানুষের অস্বীকার করার প্রবণতাকে। 

সিনেমাটিকে বর্ণ, শ্রেণি ও পুঁজিবাদের একটি তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণও বলা যায়। আম্যান্ডা ও রুথের মধ্যেকার কথোপকথন দেখায়, কীভাবে সংকটকালে মানুষের পুরোনো সামাজিক বিভেদ আরও প্রকট হয়। এই বিভেদ, টিকে থাকার মৌলিক তাগিদের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কে কাকে বিশ্বাস করবে, আর কার কাছে বেশি সম্পদ আছে- এই প্রশ্নগুলোই চূড়ান্ত টিকে থাকার নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়।

বিপর্যয়ের ইঙ্গিত
লিভ দ্য ওয়ার্ল্ড বিহাইন্ড একটি মহাপ্রলয় বা অ্যাপোক্যালিপ্স চলচ্চিত্র নয়; এটি বিপর্যয়ের প্রবেশদ্বার। পরিচালক স্যাম ইসমাইল একটি নির্দিষ্ট উপসংহারে না পৌঁছে, দর্শকদের এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। এই অসম্পূর্ণতা, কারও কারও কাছে হতাশার কারণ হতে পারে। কিন্তু এটিই এই সিনেমার শৈল্পিক সাফল্য। কারণ, এই অসম্পূর্ণতা ও অনিশ্চয়তাটাই আসলে আমাদের সামাজিক উদ্বেগের প্রতিফলন। 

আমাদের বর্তমান সমাজের ভুল তথ্য এবং বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার যুগে এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি সিনেমা। আপনি যদি একটি স্লো-বার্ন, মনস্তাত্ত্বিক এবং থিমেটিকভাবে সমৃদ্ধ সিনেমার সন্ধানে থাকেন, তাহলে ‘লিভ দ্য ওয়ার্ল্ড বিহাইন্ড’ অবশ্যই দেখুন।

আরও পড়ুন

×