ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভিক্টরের তৈরি ‘মনস্টার’-এর চোখে ভয় নয়, আছে নিঃশব্দ প্রশ্ন

ভিক্টরের তৈরি ‘মনস্টার’-এর চোখে ভয় নয়, আছে নিঃশব্দ প্রশ্ন
×

ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সিনেমার একটি দৃশ্য। ছবি: ছবি: নেটফ্লিক্স

মীর সামী

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:১৯ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:২৭

‘অ্যা ক্রিসমাস ক্যারোল’-এর মতোই ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ এমন এক গল্প, যা মানবসভ্যতার অপরাধবোধ, একাকিত্ব ও দায়বোধের প্রতীক হয়ে যুগে যুগে ফিরে আসে নতুন অর্থে। এই গল্পগুলোর এত এতবার  রূপান্তর, পুনর্নির্মাণ হয়েছে, যে নতুন কোনো সংস্করণ দেখে বিস্মিত হওয়া প্রায় কঠিন। কিন্তু এবার অস্কারজয়ী নির্মাতা গিলার্মো দেল টোরো বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন।

মেক্সিকান এই চলচ্চিত্রকারের হাত ধরে আবারও জীবিত হয়ে উঠেছেন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে মানুষ ও দানবের পার্থক্য যেন ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। দেল টোরো বহু বছর ধরে এই সিনেমাটি নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি একাধিকবার বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থাতে প্রস্তাব দিয়েও কাজের জন্য কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা পাননি। কারণ, তাঁর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন কোনো সাধারণ হরর সিনেমা নয়। এটি ভালোবাসা, অপরাধবোধ, একাকিত্ব আর সৃষ্টির নৈতিক দায়ের গল্প। 

অবশেষে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স তাঁকে দিয়েছে সেই স্বাধীনতা, যার ফলে জন্ম নিয়েছে তাঁর অন্যতম ব্যক্তিগত ও দার্শনিক সিনেমা ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ (২০২৫)। নতুন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন যেন একেবারে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে মেরি শেলির ক্লাসিক দুনিয়াকে। দেল টোরোর দৃষ্টিভঙ্গিতে গল্পটি এমনভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, যা গথিক ঘরানার ভয়াবহতা ও মানবিক সৌন্দর্যকে এক অনবদ্য ভারসাম্যে বেঁধে রাখে। 

সিনেমার শুরুটা তুষারে ঢাকা এক নির্জন দুর্গে। ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন (অস্কার আইজ্যাক) এক তরুণ বিজ্ঞানী, যাঁর মনে স্রষ্টা হওয়ার এক উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা। মৃতদেহের অংশ জোড়া লাগিয়ে নতুন প্রাণ সৃষ্টির এই সাহসী পরীক্ষাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো ঘটনা। সে তৈরি করে নতুন এক প্রাণ। এই মানুষটি পরে তাঁর নিজের সীমা ভেঙে তাঁর ভিক্টরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। সমাজ তাঁকে ‘মনস্টার’ বলতে শুরু করে। দেল টোরোর ক্যামেরায় এই দৃশ্যগুলো নিছক ভৌতিক নয়; বরং গভীর প্রতীকী। বিজ্ঞানীর চোখে আমরা দেখি মানুষ কতটা দূর যেতে পারে ‘অমরত্ব’-এর লোভে। ভিক্টরের তৈরি ‘মনস্টার’ এর চোখে ভয় নয়, আছে নিঃশব্দ প্রশ্ন। “আমি কে?” এই এক প্রশ্নই গোটা ছবির দর্শনকে বয়ে নিয়ে যায়। 

জ্যাকব এলর্ডি অভিনীত সেই ‘মনস্টার’ এর চোখ দিয়ে আমরা পৃথিবী দেখি। ছবির প্রথমার্ধে দেখা যায় ভিক্টরের মানসিক জটিলতা, তাঁর ঈর্ষা, অপরাধবোধ ও সৃষ্টির প্রতি আতঙ্ক। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কাহিনি বদলে যায়। তখন ফোকাস চলে যায় সেই সৃষ্ট প্রাণীর দিকে। যে ভালোবাসতে চায়, স্পর্শ করতে চায়, কিন্তু পায় শুধু ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান। এই দৃষ্টিকোণ বদলই সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। কারণ, এখানেই দর্শক বুঝতে পারে ‘দানব’ আসলে কে? সেই প্রাণ, নাকি তাঁর স্রষ্টা?


‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ এর একটি দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স

অস্কার আইজ্যাক ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন চরিত্রে অভিনয় করেছেন এক বিরল সংযম নিয়ে। তাঁর চোখে উন্মত্ততার ঝলক যেমন আছে, তেমনি অপরাধবোধের ছায়াও। যেন নিজের ও শয়তানের দ্বন্দ্বে জর্জরিত এক মানুষ। অন্যদিকে জ্যাকব এলর্ডির অভিনয় হয়ে উঠেছে ছবির আত্মা। নীরব মুহূর্তগুলোয় তাঁর শরীরের ভাষা, কাঁপা নিঃশ্বাস, কিংবা ফিকে আলোয় ঝলসে ওঠা চোখের দৃষ্টি। মিয়া গোথের এলিজাবেথ চরিত্রেও রয়েছে সূক্ষ্মতার গভীরতা। প্রেম, ভয় আর বিজ্ঞান। এই তিনটি শক্তির টানাপোড়েনে থাকা এক নারীর চরিত্রে তিনি যেন প্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যিনি শেষ পর্যন্ত ভিক্টরের পাগলামির সাক্ষীও।

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটির প্রথম প্রদর্শনীতে দর্শকরা টানা ১৩ মিনিট দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায়; যা দেল টোরোর ক্যারিয়ারে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

দ্য হলিউড রিপোর্টার লিখেছে, ‘দেল টোরো মানবতাকে ভয়াবহতার মধ্যেও সুন্দর করে তুলেছেন। তাঁর ‘মনস্টার’ আমাদেরই প্রতিচ্ছবি।’ তবে কিছু সমালোচক মনে করছেন, ছবির ধীর গতিপ্রবাহ হয়তো বাণিজ্যিক দর্শকের ধৈর্য পরীক্ষা করবে। কিন্তু যারা দেল টোরোর সিনেমা চিনেন, তারা জানেন। এটি কোনো হরর নয়; বরং আত্মার গল্প।

দেল টোরো নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি ছোটবেলায় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দেখে ভয় পাইনি; বরং কেঁদেছিলাম। আমি তাকে দানব মনে করিনি, তাকে একা মনে হয়েছিল। এই ছবিতে আমি সেই একাকিত্বকেই তুলে ধরেছি।’ এই একাকিত্বই ছবির মূল দর্শন। যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু অনুভূতি নয়, এক দায়িত্বও। সিনেমার শেষ দৃশ্যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ও তাঁর সৃষ্টি। দুজনের চোখে একই প্রশ্ন ভাসে, ‘যদি ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেন, তবে আমাদের ব্যর্থতা কার?” এই প্রশ্নের উত্তর দেল টোরো দেন না; বরং দর্শককে ভাবতে দেন। আমরাও কি কখনও আমাদের ভালোবাসা, সৃষ্টি বা সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা ভুলে যাই না?

ফ্রাঙ্কেনস্টাইন কোনো রক্তাক্ত হরর নয়। এটি এক অন্তর্জাগতিক যাত্রা। দেল টোরোর সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভয় আসলে আমাদের মধ্যেই আছে। এই কারণেই দেল টোরোর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন শুধু পুনর্নির্মাণ নয়, এটি এক পুনর্জন্ম। যেখানে মৃত্যু ও জীবনের মাঝখানে, আলো ও অন্ধকারের সীমানায় দাঁড়িয়ে এক মানুষ খুঁজে ফেরে নিজের পরিচয়, নিজের ভালোবাসা আর নিজের অপরাধবোধের উত্তর।

আরও পড়ুন

×