ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

এড শেরানের ভিন্ন এক যাত্রা

এড শেরানের ভিন্ন এক যাত্রা
×

এড শেরান। ছবি: নেটফ্লিক্স

মীর সামী

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | ১৫:৫০

সেদিন নিউইয়র্ক যেন নিজের নিয়ম ছেড়ে এক অদ্ভুত বিস্ময়ে ভেসে যাচ্ছিল। সকাল নয়, রাতও নয়। মাঝদুপুরের হালকা আলোয় শহরটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, আজ এখানে কিছু অন্যরকম ঘটতে যাচ্ছে। রাস্তাঘাটে মানুষের হাঁটা, কফির গন্ধ, সাবওয়ের ভিড়। সবই যেমন প্রতিদিনের মতো, ঠিক তেমনই আবার খানিক অন্য। আর এই ‘অন্যরকম’ হওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন, এড শেরান।

থিয়েটারের সাউন্ডচেক শেষ করে বাইরে পা রাখতেই তিনি যেন শহরটার দিকে হাসিমুখে মাথা নুইয়ে বললেন, ‘চলো, আজ তোমার সঙ্গে একটু সময় কাটাই।’ আর এরপর শুরু হলো এক অদৃশ্য মিউজিক্যাল যাত্রা। যেখানে কোনো চিত্রনাট্য নেই, নেই কোনো প্রস্তুতি, নেই নিত্যকার শোর অতি সাজানো মঞ্চ। আছে শুধু শহর, মানুষ, আর গান।

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই এড গুনগুন করে গাইছিলেন। মানুষ তাঁকে দেখে থমকে যাচ্ছিল, অনেকে বুঝতেই পারছিল না সত্যিই কি এডকে দেখছে, নাকি ছদ্মবেশী কেউ রসিকতা করছে? এক বৃদ্ধা হাসিমুখে বললেন, ‘ওহ মাই গড, ইটস রিয়েলি ইউ’?

এড হেসে বললেন, ‘মেবি, ডিপেন্ডস অন ইফ ইউ লাইক মাই সং’। বৃদ্ধার হাসির শব্দ মিশে গেল ক্যামেরার নীরব ক্লিক আর রাস্তায় চলতে থাকা মানুষের যাত্রায়। একজন ছোট্ট বাচ্চা দৌড়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলে এড তাকে তুলে নিলেন, যেন দুজনের দেখা হওয়া এই শহরের সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়।

একজন ডেলিভারি বয়ের বাইকের পাশেই থেমে তিনি বললেন, ‘নাইচ রাইড ম্যান’। ছেলেটা সেকেন্ড দুয়েক বুঝে উঠতেই পারল না, তারপর সেই চওড়া হাসি ছড়িয়ে দিল নিউইয়র্কের ব্যস্ত দুপুরে অন্যরকম উষ্ণতা। মনে হচ্ছিল, ক্যামেরা আর এড দুজনেই নিউইয়র্কের সঙ্গে নৃত্যে লিপ্ত। রাস্তায় হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ ক্যামেরা নিচু হয়ে এডের পায়ের ছন্দ ধরে, আবার পর মুহূর্তেই উড়তে উড়তে পার্কের ওপর দিয়ে তাঁকে অনুসরণ করে। একবার যেন ক্যামেরা অন্ধকার সাবওয়ে টানেল পেরিয়ে আলো-আঁধারির দিকে ছুটে গেল, তারপর আবার ম্যানহাটানের কোলাহলে ভেসে উঠল– এ যেন পুরো শহরটাই সিনেমাটোগ্রাফারের গোপন যন্ত্রের ভেতর সুরের মতো বাজছে। 

এক বন্ধুর প্রেম প্রস্তাবের মুহূর্তে এডের গান যেন এক অদৃশ্য আশীর্বাদ হয়ে নেমে এল। মেয়েটির চোখে জল, ছেলেটির গলার স্বর কেঁপে ওঠা। আর এডের গিটারের তারে প্রতিটি টান যেন তাদের গল্পের অংশ। সে মুহূর্তে এড কোনো তারকা নন, তিনি সেই বন্ধুই, যে পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘ভয় পেও না, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ শহরের মাথার ওপর চলে যাওয়া ট্যুরিস্ট বাসের ওপর দাঁড়িয়ে এড যখন গান শুরু করলেন, তখন আকাশের আলোও যেন একটু নরম হয়ে এলো। বিদেশি পর্যটকরা প্রথমে বিশ্বাসই করল না, এ যেন সিনেমার দৃশ্য। একজন বৃদ্ধ দম্পতি হাত ধরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন; গান শুরু হতেই দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলেন। কেউ রেকর্ড করছিল, কেউ না নড়েই দাঁড়িয়ে ছিল, একটু আগে যা ছিল সাধারণ শহুরে বিকেল, তা পরিণত হলো এক ক্ষুদ্র কনসার্টে।

শহরের উঁচু এক ছাদে জন্মদিনের মেয়েটি এডকে সামনে দেখে প্রথমে বাকরুদ্ধ, তারপর চোখে জল, আর শেষে বিস্ময়ে হেসে ওঠা। এই ছোট্ট মানবিক মুহূর্তটুকু শহরের কোলাহলের মধ্যেও যেন নীরব হয়ে দাঁড়ায়। বেলুনে ভরপুর ছাদে এডের গিটারের শব্দ যেন আকাশেই ভেসে যাচ্ছিল। এরপর লিফটের সেই অদ্ভুত নীরবতা। এক ভদ্রলোকের গম্ভীর মুখ আর এডের কাঁধে গিটার। ক্যামেরা সেই কমেডি-গাম্ভীর্যটুকু এত নিখুঁতভাবে ধরল যে মনে হলো, নীরবতাও কখনও কখনও গল্প হয়ে ওঠে। পাবে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে এডের ছোট্ট আড্ডা যেন মনে করিয়ে দিল– সংগীত কোনো প্রেক্ষাগৃহে জন্মায় না; বরং মানুষের সঙ্গে গিটারের তারের মাঝে। কেউ গলা মেলাল, কেউ টেবিলে চাপ দিল, কেউ শুধু শুনল, মুহূর্তে স্রেফ আলোতে ভাসতে থাকল। সাবওয়ের ভিড়ে দাঁড়িয়ে এড যখন গান ধরলেন, তখন কেমন যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল চারপাশ। খানিকক্ষণ যেন ভিড় ভুলে গেল তাড়াহুড়ো। এক ট্রেন থামল, মানুষ নামল-ওঠল, তবুও গান ছুটল নিজের ছন্দে। এডকে দেখে মনে হচ্ছিল, এটাই তাঁর মঞ্চ।

যখন এড থিয়েটারে ফিরে গেলেন, মনে হচ্ছিল, তিনি পুরো শহরের সঙ্গেই ফিরে যাচ্ছেন। লবির আলো, মানুষের ভিড়, ব্যাকস্টেজের নীরবতা। তারপর যখন তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রথম নোট তুললেন, হঠাৎ পুরো যাত্রা যেন এক বৃত্তের মতো সম্পূর্ণ হয়ে গেল। এড যেন পুরো নিউ ইয়র্কের হাত ধরে বললেন ‘দেখো, আমার গান তোমাদের রাস্তায়ও বাজতে পারে।’

এভাবেই ব্যারানটিনির পরিচালনা আর নিক অ্যালেনের ক্যামেরাবন্দি করল এক দুপুরের শহরের আবেগ, আনন্দ, বিস্ময় এবং সংগীত-এড শেরানের চোখে দেখা নিউইয়র্কের এক দিনের গল্প; যা কখনও আর্ট ফিল্মের মতো ধীর, কখনও শহরের কোলাহলের মতো দ্রুত; যা বিশ্ববাসী দেখবে আগামীকাল। কাল নেটফ্লিক্সে দেখা যাবে এড শেরানের সেই অনন্য যাত্রার গল্পটি।

আরও পড়ুন

×