টিকে থাকার লড়াইয়ে অনন্য এক নয়নতারা
নয়নতারা। ছবি: ভোগ ইন্ডিয়া
উপমা পারভীন
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:১৩ | আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:৫০
দক্ষিণি সিনেমার অলিখিত নিয়ম। নায়ক কেন্দ্রে, নায়িকা সহচর। বহু দশক ধরে এই ধারায় ভাঙন ধরাতে পারেননি কেউ। কিন্তু সেই ধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের জায়গা বানানো এক অভিনেত্রী আজ দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে আলোচিত নাম, তিনি নয়নতারা। যিনি বর্তমানে শুধু নায়িকা নন, এককথায় একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছেন। ক্যারিয়ারের চূড়ায় পৌঁছেও তিনি থেমে নেই। আগামী দু-বছর তাঁর হাতে রয়েছে একাধিক ভাষার, একাধিক ঘরানার সিনেমা। ফলে দর্শক অপেক্ষায় আছেন–নয়নতারা আবার কোন চরিত্রে হাজির হবেন? কোন গল্পকে তিনি বেছে নেবেন নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য?
কেরালার ছোট্ট শহর বেঙ্গালুরে ১৯৮৪ সালের ১৮ নভেম্বর জন্ম নেওয়া নয়নতারার আসল নাম ডায়ানা মারিয়াম কুরিয়ান। মালয়ালম সিনেমা দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করে ছড়িয়ে পড়েন তামিল এবং তেলেগু সিনেমায়। শুরুর দিকে গ্ল্যামারাস চরিত্রে দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে গড়ে তোলেন। ‘রাজা রানি’ ও ‘আরাম্ম’ তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো কাজ। বিশেষ করে ‘আরাম্ম’ সিনেমায় জেলা প্রশাসকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় প্রমাণ করে দেয়। নায়িকা মানেই শুধু প্রেমের অবলম্বন নয়, গল্পের চালিকাশক্তিও হতে পারে। সেই সিনেমায় মুখের অভিব্যক্তি থেকে শুরু করে সংলাপের ভঙ্গি, প্রতিটি বিষয়ই ছিল জীবন্ত।
‘মায়া’ (২০১৫), ‘কোলামাভু কোকিলা’ (২০১৮), ‘নেত্রিকান্ন’ (২০২১) এই সিনেমাগুলো প্রমাণ করে, শুধু নয়নতারার পর্দা উপস্থিতিই দর্শক টানার জন্য যথেষ্ট। ‘মায়া’ ছিল দক্ষিণি সিনেমার প্রথম দিকের সফল নারীকেন্দ্রিক হরর থ্রিলার, যেখানে তিনি একক নায়িকা হিসেবে পুরো সিনেমা কাঁধে নিয়েছিলেন। ‘কোলামাভু কোকিলা’তে তিনি এমন এক মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি সন্তানকে বাঁচাতে মাদক মাফিয়ার জগতে পা বাড়ান।
‘নেত্রিকান্ন’ ছিল একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীর প্রতিশোধের গল্প। প্রতিটি চরিত্রই যেন সময়ের প্রয়োজনে জন্ম নেওয়া। ক্ষেত্রেপ্রযোজকরা এখন তাঁর নাম শুনেই বিনিয়োগে আগ্রহী হন, যা আগে নায়িকাদের খুব একটা দেখা যেত না। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন নায়িকাও বক্স অফিসের ‘ওপেনিং অ্যাট্রাকশন’ হতে পারেন। এখন কোনো সিনেমার পোস্টারে ‘নয়নতারা’ নামটি থাকলেই দর্শক হলে আসতে রাজি।
বর্তমানে দক্ষিণি ইন্ডাস্ট্রিতে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন নয়নতারা। তিনি একটি সিনেমার জন্য যে পারিশ্রমিক নেন (৭ থেকে ১০ কোটি রুপি), তা অনেক ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় নায়কদের সঙ্গেও পাল্লা দেয়। বলিউডের ‘জওয়ান’ সিনেমার জন্য তিনি ১০ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিয়েছেন।
এ ছাড়া ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট থেকে তিনি বছরে ৫-৭ কোটি রুপি আয় করেন। একটি মাত্র বিজ্ঞাপনেই তিনি ৫ কোটি রুপি নেন। নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘রাউডি পিকচার্স’ থেকে আসে বাড়তি আয়। সব মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি রুপি। তিনি নিজের একটি প্রাইভেট জেট কিনেছেন, যার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি রুপি। চেন্নাইয়ে তাঁর বিলাসবহুল বাড়ির দাম প্রায় ১০০ কোটি রুপি। এই আর্থিক অবস্থান শুধু তাঁর জনপ্রিয়তার ফল নয়। এটি তাঁর ব্র্যান্ড ভ্যালু, বক্স অফিস নির্ভরতা এবং ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি।
ব্যক্তিগত জীবনেও কম আলোচনায় ছিলেন না নয়নতারা। সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, বিতর্ক। সবকিছুর মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে। প্রথম দিকে অভিনেতা সিলাম্বরাসানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের খবর পাওয়া যায়। পরে কোরিওগ্রাফার ও অভিনেতা প্রভুদেবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ব্যাপক আলোচিত হয়। এরপর নির্মাতা বিগনেশ শিবনকে বিয়ে করে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে স্থিরতা আনেন। ২০২২ সালে স্যারোগেসির মাধ্যমে তাদের যমজ সন্তান হয়। সংসার, সন্তান, স্বামী। সব মিলিয়ে তিনি এখন সম্পূর্ণ।
দীর্ঘদিন দক্ষিণি সিনেমায় রাজত্বের পর বলিউডে আত্মপ্রকাশও ছিল অপেক্ষার প্রহর গোনা। প্রায় দেড় দশক দক্ষিণে কাজ করার পর অবশেষে তিনি ‘জওয়ান’ সিনেমায় শাহরুখ খানের বিপরীতে অভিনয় করেন। সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ১১০০ কোটি রুপির বেশি আয় করে। শাহরুখ খানের সঙ্গে নয়নতারার কেমিস্ট্রি ব্যাপক প্রশংসিত হয়। হিন্দি দর্শকও তাঁকে গ্রহণ করেছে নিজের করে। তাই নয়নতারা এখন প্রতিনিয়ত অপেক্ষায় থাকেন। নতুন গল্পের, নতুন চরিত্রের। শুধু দক্ষিণ নয়, গোটা ভারতীয় সিনেমা এখন অপেক্ষায়। বলিউডে তাঁর পরবর্তী সিনেমা কোনটি হবে, সেটাও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
নয়নতারার আসন্ন সিনেমার তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, তিনি কোনোভাবেই থামার পাত্রী নন। সামনের দুই বছর তাঁর জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত হতে চলেছে। তালিকার শুরুতেই রয়েছে এই পিরিয়ড গ্যাংস্টার ড্রামা ‘টক্সিক’। সিনেমাটি পরিচালনা করছেন গীথু মোহনদাস। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন ‘কেজিএফ’-খ্যাত যশ। বাজেটের দিক থেকে এটি অন্যতম বৃহৎ ভারতীয় সিনেমা। এই সিনেমার শুটিং হয়েছে পর্তুগাল, লন্ডন ও ভারতে। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তির কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে ট্রেলার ও পোস্টার প্রকাশের আগে থেকেই সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
এ ছাড়াও আছে ‘প্যাট্রিয়ট’। এটি একটি স্পাই-অ্যাকশন থ্রিলার। এতে অভিনয় করছেন মালয়ালম সিনেমার দুই কিংবদন্তি মাম্মুট্টি ও মোহনলাল। ‘মুকুথি আম্মান ২’ সিনেমায় তিনি ফিরছেন সেই শক্তিশালী দেবী চরিত্রে। আরও আছে ‘হাই’ ও ‘মান্নাঙ্গাট্টি’ নামে দুটি ভিন্ন ঘরানার তামিল সিনেমা। একটি সামাজিক ড্রামা, অন্যটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার।
নায়িকা থেকে ‘লেডি সুপারস্টার’ এই যাত্রা সহজ ছিল না। সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান, টাইপ কাস্টিংয়ের জাল পেরিয়ে তিনি আজ দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী মুখ। এমন একটা সময়ে যখন অভিনেত্রীদের ক্যারিয়ার খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়, তিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে টিকে আছেন। কেবল টিকে থাকা নয়, প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন। দক্ষিণি সিনেমায় তিনি শুধু একটি নাম নন– একটি অবস্থান, একটি প্রভাব এবং এক নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।
- বিষয় :
- নয়নতারা
