গৎবাঁধা পথে নয়, নতুন সুরের সন্ধানে হাবিব
হাবিব ওয়াহিদ
রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:৩৯ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:৩৯
হাবিব ওয়াহিদ–সংগীত ভুবনের নন্দিত এক নাম। সৃষ্টির নিজস্বয়তায় তিনি একান্তই তাঁর মতন। নাটক, সিনেমার প্লেব্যাক থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, টিভি ফিলারের সুর ও সংগীতায়োজন, অডিও-ভিডিও গান ও অ্যালবাম প্রকাশনাসহ নানারকম আয়োজনে রেখেছেন সাফল্যের স্বাক্ষর। অনিন্দ্য গায়কি আর কথা, সুর, সংগীতের মেলবন্ধনে আন্দোলিত করে চলেছেন শ্রোতা হৃদয়। তাঁর সংগীত সফর নিয়ে লিখেছেন রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ
একজন সুর স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির অন্য সবার কতটা আলাদা হয়ে উঠতে পারেন, তার অনন্য এক উদাহরণ হাবিব ওয়াহিদ। মনের গহিনে ডুব দিয়ে তিনি যে সুর তুলে আনেন, তা কীভাবে যেন বাকি সবার চেয়ে আলাদা হয়ে যায়। শুধু মুগ্ধ করে রাখা না, তাঁর সংগীতের বুনন রীতিমতো বিস্ময় জাগায় গানের ভুবনের বাসিন্দাদের। তাইতো অনেকে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন, সৃষ্টির নিজস্বয়তায় হাবিব ওয়াহিদ একান্তই তাঁর মতন; যার তুলনা চলে কেবল তাঁর সঙ্গে।
অন্য সবার চেয়ে তাঁর এই আলাদা ওঠা, সুরের স্রোতে ভেসে চলা ঈর্ষা জাগানিয়া। এমন হওয়ার কথা, কারণ যে মানুষটি প্রতিনিয়ত সৃষ্টির নেশায় ডুবে থাকেন, নিরলস অনুসন্ধান করে চলেন নতুন কিছুর, তাঁর সৃষ্টি আর যা-ই হোক গৎবাঁধা হবে না– এমন মন্তব্য করেন সংগীতাঙ্গনের সেই মানুষগুলো, যারা তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। একটু নজর দিলে আমরাও দেখতে পাই, রেকর্ডিং স্টুডিওতে বসে দিনরাত কথা-সুর-সংগীতের বিস্তর কাটাছেঁড়া করে চলেছেন হাবিব।
প্রতিটি কাজের পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টায় এতটুকু ক্লান্তি নেই তাঁর। আর যখন মনে হচ্ছে, প্রত্যাশামাফিক কাজ হয়েছে তখনই কেবল সেই গানটি শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে উদ্যোগ নিচ্ছেন। কখনও আবার এমনও হয়, একটি গান প্রকাশের পরেও পুনরায় নতুন শব্দ সংযোজন করে নতুন ভার্সন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে তাঁর গান ‘হিট’, ‘ফ্লপ’, ‘অ্যাভারেজ’-এর তকমা পাবে, সেটি নিয়ে চিন্তিত নন। আর এভাবে বছরের পর বছর এভাবেই নানা ধরনের আয়োজন তুলে ধরছেন হাবিব।
এমন ধারাবাহিকতা এ সময়ের খুব কম শিল্পীদের ও সংগীতায়োজকদের বেলায় চোখে পড়ে। তার চেয়ে বড় কথা হলো– তারকাখ্যাতিকে পুঁজি করে অনেকেই যখন গৎবাঁধা আয়োজনে মত্ত, তখন হাবিব তাঁর সুর-সংগীতের মধ্য দিয়ে বড় একটা ঝাপটা দিয়েছেন। উদাহরণ রেখেছেন, কীভাবে সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে সংগীতের আবহ।
তাই নন্দিত এই শিল্পী ও সংগীত পরিচালকের কাছে শুরুতে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সংগীত সৃষ্টিতে তাঁর ভাবনা ও অনুপ্রেরণার উৎস কোথায়? এর উত্তরে হাবিব বলেন, ‘এই দেশ এই মাটি, শিকড় সংস্কৃতি আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে সুরের জগতে প্রবেশ করার জন্য। পৃথিবীর অনেকে জানেন না, আমাদের সংস্কৃতি কতটা শক্তিশালী। তাই গানের বিষয়ে আমি যেমন শিকড়কে ভুলতে পারিনি, তেমনি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য অভিনব আয়োজনগুলো পরখ করে দেখার চেষ্টা করেছি। সেই চেষ্টা আরও গতিশীল হয়েছে শ্রোতাদের ভালো লাগা আর সমর্থনে। তাইতো একদিকে যেমন ফোক ফিউশন করে গেছি, তেমনি অন্যান্য ঘরানার সংগীত নিয়ে নিরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সাহস পেয়েছি। আর আজকের আমি হয়ে ওঠার পেছনে মূলশক্তি ছিল শ্রোতার নিখাঁদ ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিতে নিরলস কাজে ডুবে থাকা; মনের অতল ডুব দিয়েই নতুন সব সুর তুলে আনা।’
হাবিবের কথায় বোঝা গেল, শ্রোতাদের ভালোবাসাকে পাথেয় করে তিনি একের পর এক সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। কিন্তু সেই গানগুলো সংগীতপ্রেমীদের কাছে কতটা অভিনব ও হৃদয়স্পর্শী হয়ে উঠবে, তা বুঝতে পারেন কীভাবে? এ জবাবে হাবিব বলেন, ‘এ কথা সত্যি যে, গান তৈরি করার পর আগে থেকে অনুমান করা কঠিন, সেটি শ্রোতা মনে কতটা ছাপ ফেলবে। তাই যতক্ষণ নিজের ভালো না লাগে, ততক্ষণ পর্যন্ত সুর-সংগীতের কাটাছেঁড়া চালিয়ে যাই। নিরীক্ষারও কোনো সীমা-পরিসীমা বেঁধে দেই না। যখন মনে হয়, সবকিছু পরিকল্পনামাফিক হয়েছে, তখন বিশ্বাস জাগে, গান অনেকের ভালো লাগবে। এভাবেই একেকটি গানের সৃষ্টি প্রকাশনা ধরে রেখেছি।’
হাবিবের কথার সূত্র ধরে আমরা যদি পেছন ফিরে তাকাই, তাহলে দেখি, তিনি যা বলেছেন তা এতটুকু মিথ্যা নয়। গানের ভুবনে তাঁর সূচনা লোকগানের ফিউশনধর্মী আয়োজন নিয়ে হলেও মৌলিক গানে তিনি কতটা পারদর্শী– তা জানান দিতেও খুব একটা সময় নেননি। একুশ শতকের প্রথম ভাগে ক্যাসেট ও সিডি আকারে প্রকাশিত ফোক ফিউশন অ্যালবাম ‘কৃষ্ণ’ ও ‘মায়া’র সংগীতায়োজন দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন হাবিব। এরপর কালজয়ী গানের ‘ময়না’ অ্যালবামের মধ্য দিয়ে তিনি জানান দিয়েছিলেন, রিমেক ও মৌলিক গানেও তিনি সমান পারদর্শী।
এরপর ‘রেখো না তো ভয় মনে’, ‘চল সবাই’, ‘সূর্য বলে চুল শুকাতে আমার রোদে আসোনা’, ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’, ‘বাংলালিংঙ্ক থিম ট্র্যাক’, ‘আরটিভি থিম ট্র্যাক’ [সময় তোমার অপেক্ষায়]সহ একের পর অভিনব জিঙ্গেল তৈরি করে প্রমাণ করেছিলেন, সংগীতের দৃশ্যপট বদলে দিতে তিনি কতটা আত্মপ্রত্যয়ী। একক অ্যালবাম ‘শোন’, ‘বলছি তোমাকে’, ‘আহ্বান’, ‘স্বাধীন’-এর পাশাপাশি বিভিন্ন সিনেমায় প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে ‘ভালো বাসবো বাসবো রে বন্ধু’, ‘হৃদয়ের কথা’, ‘বাহির বলে দূরে থাকুক [দ্বিধা], অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা হিসেবে নাম লিখিয়েছেন তিনি। নিজের পাশাপাশি মেহরীন, ন্যান্সি, শিরিনসহ বেশ শিল্পীর একাধিক অ্যালবামের সংগীত পরিচালক হিসেবেও সুনাম কুড়িয়েছেন। অ্যালবাম যুগের পর অনলাইনে প্রকাশিত একক ও দ্বৈত গান ‘হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা’, ‘মন ঘুমায় রে’, ‘মিথ্যা’, আবার তুই’, ‘নদী’, ‘মনের ঠিকানা’, ‘আনমনা মন’, ‘তোমার আকাশ’, ‘গোলাপের দিন’, ‘অবুঝপনা’, ‘দিশেহারা মন’, ‘বন্ধুরে’, ‘এই পথ চাওয়া’, ‘কোন খেয়ালে’, ‘দহন’, ‘পাগল হাওয়া’, ‘জানি না’, ‘দিলানা’ থেকে ‘প্রেমের কলঙ্ক’ পর্যন্ত অসংখ্য গান যা শ্রোতার মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।
তাই নন্দিত পপস্টার ফেরদৌস ওয়াহিদের এই যোগ্য উত্তরসূরি হাবিবকে চিনে দিতে তাঁর সৃষ্টিই ছিল যথেষ্ট। অবাক করা বিষয় হলো, হাবিব যখন ইংল্যান্ডের সাউন্ড ডিজাইনে পড়াশোনা করছিলেন, তখন থেকেই তার অভিনব সংগীতায়োজনের খবরা-খবর দেশীয় শিল্পী মিউজিশিয়ানদের কানে পৌঁছে গিয়েছিল। বাপ্পা মজুমদারের পাশাপাশি ব্যান্ড আর্ক ও মনিটর সদস্যদের পাশাপাশি আরও কিছু শিল্পী তাঁকে নিয়ে নতুন গান তৈরি করে নিয়েছিলেন। তারও কয়েক বছর আগে তাঁর মেধার বিকাশ ঘটতে দেখা গিয়েছিল রেনেগেইড ব্যান্ডের ‘মায়াবী এ রাত’ ও ‘ফিরিয়ে দাও’ অ্যালবামের গানগুলোয়। সৃষ্টিতে নিজস্বয়তা ধরে রাখার পাশাপাশি সেই ছাপ অন্যদের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত করে যাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন হাবিব। তাঁর হাত ধরে গানের ভুবনে অনেকের পরিচিতি গড়ে উঠেছে, কারও শিল্পী ও সংগীতায়োজক হিসেবে হয়েছে অভিষেক। তারপরও হাবিবের মধ্যে কখনও অহম ভর করতে দেখা যায়নি; যা আজও এক বিস্ময়।
- বিষয় :
- হাবিব ওয়াহিদ