‘জীবনে সবসময় অনেক কিছু পাওয়ার প্রয়োজন নেই’
নাজনীন নিহা। ছবি: ফেসবুক
নাজনীন নিহা
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:০৬ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:১০
ভ্রমণ আমার কাছে শুধু নতুন কোনো জায়গায় যাওয়া নয়; বরং নিজের সঙ্গে নতুন করে দেখা হওয়ার একটি সুযোগ। ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি, কাজের চাপ আর চারপাশের কৃত্রিমতা থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে যখন প্রকৃতির কাছে দাঁড়াই, তখন মনে হয় জীবনটা আসলে কত সুন্দর! সম্প্রতি ঘুরে এলাম নেপাল। আর এই ভ্রমণে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে পোখারা। পাহাড়, মেঘ, নীল আকাশ আর শান্ত পরিবেশ; সব মিলিয়ে পোখারা আমার মনে আলাদা একটি জায়গা করে নিয়েছে।
নেপালে পা রাখার পর থেকেই চার পাশের প্রকৃতি আমাকে টানছিল। তবে পোখারায় পৌঁছে সেই অনুভূতিটা আরও গভীর হয়েছে। শহর আছে, মানুষের ব্যস্ততা আছে, পর্যটকের আনাগোনা আছে, কিন্তু তারপরও পুরো জায়গাটার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি রয়েছে। দূরে পাহাড়, মাথার ওপর নীল আকাশ আর নির্মল বাতাস– মনে হচ্ছিল, পরিচিত ব্যস্ত জীবন থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি।
আমি সমুদ্র যেমন ভালোবাসি, তেমনি পাহাড়ের নীরবতাও আমাকে ভীষণ টানে। পোখারায় এসে পাহাড়কে যেন আরও কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ হলো। মেঘ কখনও পাহাড়ের চূড়া ঢেকে দিচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ পর মেঘ সরে গিয়ে পাহাড় দেখা যাচ্ছে– এই দৃশ্য বারবার দেখেও মন ভরে না।

পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, জীবনে আমরা কত ছোট ছোট বিষয় নিয়ে অস্থির হয়ে থাকি। অথচ প্রকৃতির এই বিশালতার সামনে দাঁড়ালে নিজের চিন্তাগুলো কত ক্ষুদ্র মনে হয়! পাহাড় আমাকে সবসময়ই ধৈর্য আর স্থিরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। পোখারার সকালগুলোও ছিল অন্যরকম।
জানালার বাইরে নরম আলো, ঠান্ডা বাতাস আর দূরের পাহাড়– এমন সকাল শহুরে জীবনে খুব সহজে পাওয়া যায় না। ভ্রমণের সময় আমি শুধু দর্শনীয় স্থান দেখতে চাই না। সেখানকার মানুষ, সংস্কৃতি, খাবার ও জীবনযাপনও জানতে চাই। পোখারার মানুষের সহজ-স্বাভাবিক আচরণ আমার ভালো লেগেছে। পর্যটকের আনাগোনা থাকলেও তাদের মধ্যে একটা আন্তরিকতা রয়েছে। তাদের জীবনযাপন দেখেও অনেক কিছু শেখার আছে।
পোখারার ফেওয়া লেক আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। বিশাল নীল জলরাশি, চারপাশের পাহাড় আর পানিতে আকাশের প্রতিচ্ছবি– সব মিলিয়ে জায়গাটির মধ্যে এক ধরনের মায়া আছে। লেকের পাশে বসে অনেকক্ষণ শুধু চারপাশ দেখেছি। নৌকা ধীরে ধীরে পানির ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হচ্ছে– সবকিছু মিলিয়ে সময় যেন একটু থেমে গিয়েছিল।

আমি এমন মুহূর্ত খুব উপভোগ করি। কোনো তাড়া নেই, কোনো ব্যস্ততা নেই– শুধু প্রকৃতির সঙ্গে থাকা। তখন মনে হয়, জীবনে আসলে সবসময় অনেক কিছু পাওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনও একটি সুন্দর দৃশ্যের সামনে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকাই যথেষ্ট।
বিকেলের পোখারা ছিল আরও সুন্দর। আকাশের রং বদলে যাচ্ছিল, পাহাড়ের গায়ে আলো-ছায়ার খেলা চলছিল, আর সেই দৃশ্যের প্রতিফলন পড়ছিল ফেওয়া লেকের পানিতে। ক্যামেরায় সেই মুহূর্তগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। ছবি হয়তো স্মৃতি ধরে রাখে, কিন্তু প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে যে অনুভূতি হয়, সেটি পুরোপুরি কোনো ছবিতে ধরা যায় না। নেপাল ভ্রমণ আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীটা অনেক বড়। আমাদের পরিচিত গণ্ডির বাইরে কত মানুষ, কত সংস্কৃতি, কত প্রকৃতি ছড়িয়ে আছে!
ভ্রমণ না করলে সেসব জানার সুযোগ হয় না। পোখারা থেকে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি জায়গা ঘুরে ফিরছি না; সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি পাহাড়ের নীরবতা, ফেওয়া লেকের শান্ত জল, মেঘে ঢাকা আকাশ আর কিছু সুন্দর মুহূর্ত। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, মানুষ যত ভ্রমণ করে, তত জানে, তত বড় হয়। ভ্রমণ আমাদের নতুন জায়গা চেনানোর পাশাপাশি নিজের জীবনকেও নতুন করে দেখতে শেখায়। নেপাল আমাকে সেই অনুভূতিটাই আবার দিয়েছে।
লেখক: নাজনীন নিহা, অভিনেত্রী
- বিষয় :
- নাজনীন নিহা
- অভিনেত্রী
- নাটক