ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিন্ধু সেচে মুক্তার খোঁজে

সিন্ধু সেচে মুক্তার খোঁজে
×

পদ্মার চরে পৌঁছে যাচ্ছে শিক্ষার আলো

মো. মনিরুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৩ | ০৫:২২

ডিক্রিরচর। চারদিকে জলরাশি। পদ্মার বুকে কুঁজের মতো জেগে থাকা সেই চরেই আলো জ্বালছে আশা আক্তার-জীবন মণ্ডলরা। ফরিদপুর জেলা শহর থেকে পুবে টেপাখোলা। গাড়িতে গেলে মিনিট পনেরো। রাস্তা থেকে নেমে দীর্ঘ বালুরাশি। সেই বালুতে হেঁটে হেঁটে ১০ মিনিট বাদেই খেয়াঘাট। নদীর ওপারে ডিক্রিরচর। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদী পাড়ি দিলে ভাঙ্গিডাঙ্গি গ্রাম। এই গ্রামে গড়ে উঠেছে মোতালেব হোসেন হাই স্কুল ও মোতালেব হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পদ্মার চরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে স্কুল দুটি প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ. কে. আজাদ।
ওপারের খেয়াঘাট থেকে মাটির রাস্তা ধরে হেঁটে গেলে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। ঘোড়ার গাড়ি বা ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলে গেলে সময় কিছুটা কম। আশপাশে নীরবতা। মাঝেমধ্যেই পাখির কলরব। পদ্মা থেকে ভেসে আসা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। রাস্তায় ছুটে চলা মোটরসাইকেলের ভোঁ ভোঁ আওয়াজ শোনা যায় সময়ে সময়ে। যেন নরম চাদরে কর্কশ ভালোবাসা। তার মাঝেই বালুকণা উড়িয়ে চরের বাসিন্দাদের ছুটে চলা।

পৌষের নরম রোদ গায়ে মেখে হেঁটে চলা। পথের দু'ধারে সবজির মাঠ। সবই শীতকালীন। তার মাঝে চোখ ঝলসানো সরিষা ক্ষেত। বাতাসের মৃদু দোলন, যেন হলুদ সমুদ্রে নর্তকীর নাচন। পল্লিকবির ভাষায়, 'সরষে ফুলের পাপড়ি নাড়ি ডাকছে মোরে তাই'।

পথ চলতে চলতেই চর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে মোতালেব হোসেন হাই স্কুল। প্রধান শিক্ষকের কক্ষটি আলাদা। সেখানে শোভা পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি। আরও আছে অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীর বাণীসংবলিত পোস্টার। স্কুলের লাইব্রেরির কক্ষে সাঁটানো মোতালেব হোসেন ও এ. কে. আজাদের ছবি।

২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০২২ সালে প্রথম মোতালেব হোসেন হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১০ শিক্ষার্থী। সবাই পাস। এই সাফল্য উদযাপনেই কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কৃতী শিক্ষার্থীদের জন্য সংবর্ধনার অনুষ্ঠানের আয়োজন। বিজয়ের মাসে বিজয়ের দিবসেই এ অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোতালেব হোসেন। সভাপতির আসনে স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। তিনি সমকাল প্রকাশক ও হা-মীম গ্রুপের পরিচালক।
প্রতিষ্ঠানটিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৫৭ জন। শিক্ষক ৮ ও কর্মচারী ১ জন।

এলাকাটি দুর্গম। বেশিরভাগ অভিভাবক শিক্ষিত নন। তাই বাল্যবিয়ে প্রবণতা বেশি। ছেলেমেয়েরা শৈশবেই কৃষি বা মাছ ধরার কাজে যুক্ত হয়ে যায়। স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী বেশি। কিন্তু এ স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে আসছে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শাহিন মোল্লা। তিনি আরও বলেন, এখন অভিভাবকরা সচেতন হচ্ছেন। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন শেষে দ্রুত স্কুলটি এমপিও করার দাবি তাঁর। চরের শিক্ষার্থীদের পাঠদানের এই প্রচেষ্টা এবং শিক্ষকদের আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান প্রতিষ্ঠানটিকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে বলে মনে করেন ফরিদপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিষ্ণুপদ ঘোষাল। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নানা পরিবেশনার ফাঁকে ফাঁকে দর্শকসারিতে চলছিল ছোট ছোট আড্ডা। সেই আড্ডায় আনন্দ ভাগাভাগির পাশাপাশি উঠে আসে চরের বাসিন্দাদের অনেক সংগ্রামের গল্প। ঘুম থেকে জেগেই নূ্যনতম মৌলিক চাহিদা খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়তে হয় তাঁদের। কেউ ক্ষেতে, কেউবা নদীতে। সেই যুদ্ধ হয় জয়ের, কখনওবা পরাজয়ের। যেন নিয়তি নির্ধারিত এ যুদ্ধ জয়েরই শপথ করেছে আশা-জীবনরা (ছদ্মনাম)।

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী আশা আক্তারের বাবা শেখ আলী কৃষক। মা গৃহিণী। সাত ভাইবোন। পাঁচ বোনের মধ্যে আশা চতুর্থ। নিম্নআয়ের অন্য দশ পরিবারের মতোই কষ্টের গল্প তারও পরিবারের। আক্ষরিক অর্থেই সকালে পান্তা খেয়ে স্কুলে আসা, তাও প্রতিদিন জোটে না। দিনে একবেলা রান্না করে তিনবেলা চলার চেষ্টা। ফলে প্রায়ই একবেলা না খেয়ে থাকে আশার মতো শিশুরা। অভুক্ত পেটে চলে আসে স্কুলে। সবশেষ কবে আশার পরিবার মাংস কিনেছে মনে করতে পারেনি মেয়েটি।
জীবন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তার বাবাও কৃষক। মা গৃহিণী। আগের দিনও পান্তা খেয়ে স্কুলে এসেছে জানিয়ে ছেলেটি এক বাক্যে যেন গোটা চরের চিত্রই তুলে ধরেছিল, 'এটাই আমাদের জীবন'।

দিনব্যাপী অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যা। এবার ফেরার পালা। গায়ে শীতের আঁচড়। আকাশে চাঁদের আলো আর হাতে মোবাইল ফোনের আলোয় চরের পথ ধরে এগিয়ে চলা। শহরের পথে ফিরতে ফিরতে কাজী নজরুল ইসলামের একটা কথাই মনে বাজছিল বারবার, 'কেমন করে বীর ডুবুরি সিন্ধু সেচে মুক্তা আনে, কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বর্গ পানে।'

লেখক:সম্পাদক, মফস্বল বিভাগ, দৈনিক সমকাল

আরও পড়ুন

×