শ্মশানঘাটের কবর
শিল্পকর্ম: ওয়াকিলুর রহমান
মুনিম রাব্বী
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৪৭ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩:০২
মধ্যদুপুর। আকাশভরা শরতের মেঘ। চকচকে নতুন টিনের চারচালা ঘরসহ একটি মসজিদ। বাঘারচরে এই একটিমাত্র হাফেজিয়া মাদ্রাসা। চরের দু’দিক ফাঁকা, একদিকে নদীর মরা মুখ, অন্যদিকে ধানখেত। বাতাস বইছে। কেরামত আলী অনেক্ষণ হলো হুজুরের ঘরের দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেতরে কোরআন তেলাওয়াত করছে তার ছেলে এমরান। সুরা আল মাঈদা থেকে পড়ছে। সুমিষ্ট কন্ঠ আর বড় দমের গুণে ঐশী বাণীতে বুঝি প্রাণ লেগেছে। চোখ বুজে একমনে শুনছেন হুজুর। এমরানের তেলাওয়াত শেষ হলে কেরামত আলী ভেতরে উঁকি দিলেন।
“আসসালামুওয়ালাইকুম হুজুর!
“ওয়ালাইকুমুস সালাম! কেরামত ভাই নাকি। ভালো আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ হুজুর, আছি ভালো। তয়... এমরানের মায়ের প্যাটে ব্যাথা। কিছু মুখে দিলেই বমি।”
এমরান মুখ তুলে তাকায়।
কেরামত আলী সাদাসিধা নম্র গোছের মানুষ। গরিব, তবে অভাবী নয়। তার কথা শুনে হুজুরের কপালের ভাঁজ পড়ে। বলেন, “আল্লাহ ভরসা, কেরামত ভাই। শহরের হাসপাতালে ভালো ডাক্তার বসে এখন। ব্যাথা না কমলে ওইহানে নিয়া যান। ঠিক হয়া যাইব ইনশাল্লাহ !”
“দোয়া রাখবেন হুজুর। এমরানরে ওর মায় দেখবার চাইছে। যদি একটু অনুমতি দেন!”
হুজুরের অনুমতি পাওয়া গেল। পিতা পুত্রকে কাছে টেনে নিলেন।
বাঘারচর থেকে এমরানদের বাড়ি যেতে প্রায় পুড়ো পথটাই নৌকায় যেতে হয়। গত সাত-আট দিনের অবিরাম বর্ষণে মরা নদীর কূল তলিয়ে গেছে। আকাশে মেঘের কেতন। দিগন্ত জোড়া ধানখেত। তার ভেতর দিয়ে ভেসে চলবার পথ খুঁজে নিয়েছে নৌকা। সাদা বকের উড়ে যাওয়া ফিরে আসার মত পাক খাচ্ছে বাতাস। ওরা ডিঙিতে ভেসে যাচ্ছে।
বিকেল আর সন্ধ্যার মাঝামঝি তখন। আকাশের এক কোনে আলো জ্বালিয়ে রেখেছে সূর্য। লাল আলোর ছটা এসে পছেছে বিন্নেবালার মাঠে । পু্রাতন বটগাছের ফাঁকে ফাঁকে আটকে আছে অন্ধকার। বটগাছের দক্ষিণে ছোট্ট ঘর। তাঁর ভেতর গনেশ আর লক্ষ্মীর চারু মূর্তি। নৌকা থেকে তাঁদের মুখ পরিষ্কার দেখা যায়।
বিন্নেবালার মাঠে কিছু একটার সজ্জাসজ্জা চলছে। নাগর-দোলার খুটি পোঁতা হচ্ছে। এই দেখতে দেখতে এমরানদের পথ ফুরিয়ে গেল।
মাগরীবের নামাজ পড়ে এমরান বাড়িতে এলো। এই বাড়ি তার অচেনা। অনেক দিন বাদে যখন এমরান বাড়ি ফিরত, বাড়িটা অন্যরকম দেখাত। উঠনের কোনে চুলো জ্বলত। একচুলোয় ভাতের হাঁড়ি চড়িয়ে অন্যচুলোয় মা এক হাতে পিঠা ভাজতেন অন্য হাতে মোরগের চামড়া ছাড়াতেন। ভাত হয়ে এলে ওজু করে নামাজ পড়তে যেতেন।
মাত্র দুই হাতে মা কেমন দশ হাতের কাজ একাই সামলে নিতেন! মা যেন বিন্নেবালার মাঠের দশ হাতের ঐ প্রতিমা।
অথচ আজ, সেই ঘর ,সেই উঠোন প্রেতলোকের ধ্বংশপ্রাপ্ত রাজমহল।
এমরান ঘরে ঢুকল। এতক্ষণ বুজে থাকা আকাশ বৃষ্টি ছেড়েছে।
মা এমরানকে দেখে বিছানায় উঠে বসতে চাইলেন। “বাজান তুমি আইছো? মুখ শুকায়ে গেছে ক্যান? দ্যাহ তো! শরীরটা হইলো খারাপ! ভাবছিলাম তুমি আইলে মোয়া বানামু, পিঠা বানামু!”
এমরান মাকে এত নিরুপায় কোনো দিন দেখে নাই।
“মা, তুমি ঠিক হয়া যাবা। কাইল সদর হাসপাতালে যামু। তুমি একটু সবুর কর।”
ভোরের আলো ফুটতেই কেরামত আলী এমরান আর ওর মাকে নিয়ে সদর হাসপাতালে গেল। সারি সারি গাছের মাঝখান দিয়ে ইট বাঁধানো চওড়া পথ। তাঁর মাথায় দাঁড়িয়ে আছে রং চটচটে সাদা চারতলা বিল্ডিং।
ডাক্তার সব কিছু বুঝিয়ে দিল কেরামত আলীকে। এমরানের মায়ের রোগের লক্ষন ভালো না। সব কিছু ঠিকঠাক জানতে দুই একদিন থাকতে হবে হাসপাতালেই।
গভীর রাত। এমরানের মা থেমে থেমেই কেঁদে উঠছেন। প্রচন্ড ব্যাথায় অস্থির হয়ে উঠেছেন। এমরান ছুটে গেল ডাক্তারের রুমে। দরজা মৃদু খোলা। ফাঁক দিয়ে ওপারের টেবিলের এককোনো দেখা যায়। কবাটে কাল মোটা অক্ষরে নামফলক— “ডাক্তার নিত্যরঞ্জন রায়”
কিভাবে ডাকবে এমরান সেই ভেবে পায়চারি করতে থাকে। ডাক্তার বাবু এমরানের পায়ে চলার শব্দ শুনতে পেয়ে বের হয়ে এলেন।
ডাক্তার বাবু সত্যিই অসাধারণ। এমরানের মায়ের চোখের ভাষা, যন্ত্রনার ভাষা নিখুত ভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন।
এত রাতে ওষুধ পাওয়া যাবে না ভেবে সম্ভব্য কিছু ওষুধ আগেই সাথে নিয়ে এসেছেন।
ঘুমে চোখ বুজে আসতে থাকে মায়ের।
পরের দিন আকাশ বেশ ঝকঝকে। এমরানের মাও হাশি খুশি। পেটের যন্ত্রনা নেই। কিন্তু শরীর দুর্বল। কিছু ওষুধ-পত্র বুঝিয়ে দিয়ে ছুটি দিয়ে দিলেন ডাক্তার। বললেন, “দুই মাস পর আবার আসবেন!”
খানিক সুস্থ হয়েই এমরানের মা ভুলে গেলেন গত কয়েকদিনের কথা। দুই হাতে আবার সেই সারা সংসার গুছিয়ে রাখবার তাড়া। এই কয়েকদিনে ঘরবাড়ির কি বেহাল অবস্থা! ঠেকিয়ে রাখা গেল না তাঁকে।
তিন দিন এমরানকে আদর-যত্ন করল মা।
চতুর্থ দিন বিকেলে মাদ্রাসায় ফিরে যাবে এমরান। ওদিকে লঘুচাপ ঘনিয়ে উঠেছে সাগরে। সকাল থেকেই ক্লান্তিহীন বৃষ্টি। বিকেলের পর বৃষ্টি কমলে মা-বাবার কাছথেকে বিদায় নিল এমরান। মোজাম্মেলদের বড় ট্রলার ভরে গেছে। জন প্রতি বিশটাকা ভাড়া। এমরানের মা আঁচল থেকে একশ টাকার একটা নোট এমরানের জোব্বার পকেটে রেখে দিল।
শব্দ করে ট্রলার চালু হলো। স্থির পানির বুকচিরে এগিয়ে চলেছে ট্রলার । ট্রলারে অনেক মানুষ। কেউ যাবে বাঘারচরে, কেউ যাবে মিদেনপুরে আবার কেউ যাবে বিন্নেবালার মাঠে। ভরা বিকেলে ট্রলার এসে থামল বিন্নেবালার ঘাটে। জলে জলে আটকে থাকা জনজীবন যেন প্রাণে প্রাণে প্রা্ণবন্ত হয়ে উঠেছে এখানে। নাগর দোলা, চরকা, কত শত খাবারের দোকান, হাড়ি পাতিল, খেলনা-পাতি, কী নেই। প্রকান্ড বট গাছের তলায় অস্থায়ী ছাউনি। তাঁর নিচে আশীর্বাদ পুষ্ট হাত গুলো ছড়িয়ে একনিষ্ঠ সরল চাহুনিতে তাকিয়ে আছে প্রতিমা। তাঁর এক পাশে ভয়ানক চোখ বেঁকিয়ে খুন হচ্ছে একটা দুর্ধর্ষ মানুষ অথবা অমানুষ?
এমরানকে নামতে হবে। ছোট বেলায় এই মেলায় কতবার এসেছিল সে । আজ যখন সুযোগ মিলে গেল তখন একটু মেলা ঘুরে যাবার কথা ভাবল এমরান। ট্রলার থেকে নামল। । ধবধবে সাদা জোব্বা, মাথায় হালকা বাদামী পাগড়ী, চোখে মায়ের চোখের হালকা সুরমার ধূলো। এমরানের দুচোখে যেন ধরে না। এ দোকান সে দোকান ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। রসগোল্লা খেল । কদমা , সন্দেস ,মুড়কী কিনে ব্যাগে রাখল। অনেক দিন এসব খাবার খায়নি এমরান। দিগন্তে তখন শেষ আলো ডুবে যাবে যাবে ভাব। কেউ কেউ চোখ বেঁকিয়ে দেখছিল তাঁকে। মাঝে মাঝে এমরানের নিজেকে মানুষ ভিন্ন অন্য কিছু মনে হচ্ছিল। সবাই তাঁকে এভাবে দেখছে কেন?
পূজামন্ডপের ভিতর আলোর রোশনাই। লাল নীল আলোয় ওশুড়ের দাঁত, চোখ যেন নড়েচড়ে উঠছে । চোখ আটকে গেল এমরানের। ঐ যে সিংহমূর্তিটার কাছে, কে নাচছে ওটা? দীপংকর না? হ্যা, আলবাত দীপংকর। কত দিন বাদে দেখা হল দীপংকরে সাথে। কত শত দিন খেলায় খেলায় কাটেছিল এমরান আর দিপঙ্করের। এমরান দীপংকর কে ডাক দিল, দীপংকর শুনতে পেল না ঠিক ঠাক, কিন্তু ওর নাচের ছন্দপতন হল। এমরানের দ্বিতীয় ডাকটি শুনলেও তৃতীয় ডাকেই শব্দের উৎস অর্থাৎ এমরানকে খুজে পেল দীপ। দীপ প্রতিমার দিকে একবার মুখতুলে প্রণাম করে এক দৌড়ে এমরানের কাছে ছুটে এল। শরীর ঘামে ভেজা। চোখে দীর্ঘরাত জেগে থাকার ক্লান্তি।
“এমরান তুই? কেমন আছিস?”
এমরান হাসি সামলে উত্তর দিল, “ভালো রে, আল্লায় ভালোই রাখছে। তুই কেমন আছস?”
“এইতো আছি, খারাপ না। এমন এখন মাদ্রাসায় পড়স?”
“হুম। ঐ যে, বাঘারচর মাদ্রাসায়। তুই কই পড়স?”
“পড়ালেখা বাদ। বাবার সাথে প্রতিমা বানাই।”
বেলা ডুবে কখন যে রাত জমে কাল হয়ে এসেছে চারিদিক, গল্পে গল্পে সেই খেয়াল নেই কারো। আকাশে কালো করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। মেলা ভেঙে গেছে। বাড়তি আলোগুলো নিভে গেল একে একে। সব নীরব হয়ে এলো। এমরানের চোখ কপালে। দীপ, এত রাইত হয়া গেলো, টেরই পাইলাম না। হুজুর বকব। এখন কেমনে যাই ক তো?
দীপও চমকে ওঠে বন্ধুর চিন্তায়।
“চল ঘাটে গিয়ে দেখি।”
বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ছে । খই, মুড়কি, সন্দেশ আর বাতাসা কোনো রকমে আগলে নিয়ে ঘাটের দিকে দৌড়ে গেল দুই বন্ধু। কপাল মন্দ। ঘাটে কোনো নৌকা নেই।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও নৌকার কোনো ছায়াও দেখা গেল না। খুব বড় বিপদে পড়ে গেলে মানুষের চেহাড়া যেমন দুমড়ে মুচরে যায়, এমরানের চেহারাও তাই হয়ে গেল। প্রকৃতির এমন বিরুদ্ধাচরনে কারোই কিছুই করার থাকে না।
দীপ বলল, “এখন আর নৌকা পাওয়া যাইব না। দোস্ত, এক কাম কর, ঝড়-বাদলে এখন যাওয়ার দরকার নাই। মন্ডপের পাশেই একটা ঘড়ে আমরা থাকি, ঐ খানে চল। আমি বাবারে দিয়া বামুন ঠাকুররে বলাই। কাইল ভোরে পরথম নৌকায় তুই যাইস।”
নিরুপায় এমরান। দুই বন্ধু আবার এক দৌড়ে মণ্ডপের সেই ঘরের খিড়কির কাছে এসে দাড়াল। ধবধবে সাদা জোব্বা আর পাগড়ী পড়ে আছে এমরান। চোখে সুরমা পাহাড়ের ধুলো। সবাই চোখ বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে এমরানের দিকে । এমরানের অস্বস্তি হচ্ছে। তবুও তাঁর এখানেই রাত কাটাতে হবে।
দীপংকর আর্জি নিয়ে গেল বাবার কাছে। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল বামুন ঠাকুর। শুনে আড়চোখে তাকালেন এমরানের দিকে। চেহারাই বলে দিচ্ছে তাঁর সায় নেই। দীপ মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এমরানকে এভাবে ফিরিয়ে দিতে সে পারবে না ।
দীপ ঘর থেকে বের হয়ে এমরানের হাত ধরে হাটতে লাগল। “চল কুণ্ডুদের ঘাটে যাই। ওইহানে একখান নৌকা আছে। আমি তোরে বাঘারচরে দিয়ে আসি।”
এমরানের কাছে এটাও এখন ভালো। রাত বিরাতে কোথায় থাকবে সে? কুন্ডুদের ঘাটে নৌকা পাওয়া গেল।
অবিরাম বর্ষণে কুন্ডুদের ঘাট তলিয়ে উঠোন পর্যন্ত চলে এসেছে। বৃষ্টিতে ডুবু ডুবু নৌকা। দীপ কোনো রকমে পানি সেঁচে নৌকা ভাসালো।
ভিজতে ভিজতে বাঘা্রচরের ঘাটে চলে এল ওরা। রাতবিরাতে ডাহুকের ডাক, শিয়ালের রবে ওরা বুঝি ভয়ের সাগর পাড়ি দিয়ে অবশেষে ডাঙা খুঁজে পেল।
এমরানের মনে স্বস্তি। বাঘারচরের ঘাটে নৌকা বেঁধে মাদ্রাসার দিকে এগিয়ে গেল ওরা। হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল এমরান।
“দীপ তুই ফিরবি কেমনে? এই আন্ধারে, এত বৃষ্টিতে তাও আবার একলা।”
দীপের চোখে ভয়, কন্ঠে ইতস্ততা। বলল, “তুই যা। আমার এসবের অভ্যাস আছে।”
এমরান ওর কথায় আশ্বস্ত হতে পারল না। দীপকে এত রাতে এভাবে ছাড়া যায় না। মাদ্রাসার ঘরে লন্ঠনের আলো জ্বলছে। এত রাতেও কেউ বোধয় জেগে আছে। এমরান এগিয়ে যায় মাদ্রাসার দিকে। জলাধারের পানি বেড়ে রাস্তা তলিয়ে গেছে। মাদ্রাসার উঠানেও থৈ থৈ পানি। আকস্মিক বন্যায় সব ঢুবে গেছে পানিতে। মাদ্রাসার সামনে ফটকে এসে থেমে গেল দীপ। এমরান এগিয়ে গেল। হুজুর তখনো ঘুমাননি। বারান্দার কোনে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবছেন। এমরানের চলার শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়ল তাঁর। এমরানকে দেখে দারুণ অবাক।
“এত রাইতে? কোনো বালা মসিবত?”
“না হুজুর। আইতে আইতে দেরি। ঝড় বৃষ্টিতে নৌকা পাইনাই।”
“তো কাইল আসতা। তোমারে দিয়া গেল কেডা এত রাইতে?”
এমরান ঘার ঘুড়িয়ে পিছনে তাকাল। বুনো গাঁদার ঝোপের এক কোনে দাঁড়িয়ে ধুতি পরা দীপ। ঠাণ্ডায় শরীর কাঁপছে। এমরান হুজুরের দিকে ফিরে বলল, “হুজুর, ও আমার ছোট কালের বন্ধু। ও খুব ভালো। হুজুর, রাইত তো এখন মেলা। অরে কি একটু ...
হুজুর বললেন, “হিঁদু!সমস্যা নাই, সাহস আছে ওর। যাইতে পারব।”
এমরানের পায়ের তলার পানি বাড়ছে। রাত জমাট আঁধারে ঢুবে গেছে। জল আর আঁধার বেপরোয়া হলে পথ খুঁজে হাঁটা দায়। এমরান কি করবে এবার? দীপকে এভাবে এত রাতে ছাড়া যায় না। এমরান দীপের দিকে তাকাল । দীপ সেখানে নেই। কখন চলে গেছে। বৃষ্টি তখনও বিরামহীন। মাঝে মাঝেই যেন আকাশ কেঁপে আলোর তীক্ষ্ণ ফলা নেমে আসছে। সাথে বিকট শব্দ।
এমরান দৌড়ে ঘাটের কাছে গিয়ে দেখল, দীপ গাছের তলায় জুবুথুবু হয়ে বসে আছে। এমরান পেছন থেকে ওর পিঠে হাত রাখতেই দীপ চমকে উঠল। দীপের দাঁতে দাঁতে ঠক ঠক শব্দ।
দীপ বলল, “চল এমরান। বিন্নিবালার মাঠের উত্তরের খালে আমার ছোট জ্যাঠার মাছ ধরার ভেসাল আছে। সারা রাত সে ওইখানেই থাকে। বড় মজার মানুষ। তার কাছে যাই।”
যেই ভাবা সেই কাজ। নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল দুই বন্ধু। মরা নদীর ক্ষনিকের যৌবনে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। ডাহুকের ডাক শোনা গেল? শিয়ালের ডাকে আর বুক কাঁপছে না। দূরের গ্রামগুলো যেন আঁধার জমিয়ে রেখেছে।
দীপ আর এমরান পৌঁছে গেল। দীপের ছোট জ্যাঠার ভ্যাসালের মাচালে আলো জ্বলছে। নৌকার শব্দে বের হয়ে এলো জ্যাঠা। দীপকে দেখে হাসি হাসি মুখ করে বললেন, “আরে দীপ, এই রাইতে!”
“ জ্যাঠা আইজ আমরা তোমার মাছ ধরা দেখুম।”
জ্যাঠা মশাই মহাখুশি। এই নির্জন নিরালায় কথা বলার মানুষ পাওয়া গেল।
গল্পে গল্পে মাছ ধরতে ধরতে রাত কেটে যেতে থাকে। বৃষ্টি অবিরাম। চারিদিক তখন জলের সমুদ্রে ডুবে গেছে। বাঘারচর কিংবা বিন্নিবালার মাঠ, সমস্ত তলিয়ে গেছে। জেগে আছে শুধু নদীর পারের এক টুকরো মাটি। সেখানে জড়োসড় হয়ে আশ্রয় নিয়েছে বুনো হাঁস আর কিছু পাখি।
আলো ফুটলে দূর থেকে ভেসে আসছে কারো হাহাকার। বিন্নিবালার মাঠে অসংখ্য মানুষ । শোনা গেল, বামুনঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ। বৃষ্টি পুকুর ডোবা পথঘাট সব সমান হয়ে ছিল। মন্ডপ থেকে মাঝরাতে ফেরার পথে পা পিছলে তলিয়ে যান ঠাকুর। সাঁতরে আর পাড়ে ওঠা হয়নি। এই খবরের রেশ কাটতে না কাটতেই লোকমুখে আরো একটি খবর পাওয়া গেল। বাঘারচরের মুয়াজ্জিন সাহেবকে রাতের কোনো এক সময়ে সাপে কেটেছে। দুর্যোগের ভেতর ডাক্তার কোবরেজ কাউকে পাওয়া যায়নি। ইহলোক ছাড়তে হয়েছে তাঁকেও।
বেলা গড়িয়ে দুপুর হতে চলল। বৃষ্টি তখনও বিরামহীন। গ্রামের মানুষ ভারি চিন্তায় পড়ে গেল। বামুন ঠাকুরের আত্মীয়রা সৎকারের চিন্তায় মুখ কালো করে বসে রইল। মুয়াজ্জিন সাহেবেরইবা কবর হবে কোথায়? গোরস্থান, শশ্মান সব জলের নিচে। এই পানি সহসাই নামবে না। একটু উঁচু জমি যদি কোথাও পাওয়া যায়!
দীপ আর এমরান তখন অন্য কিছু ভাবছে। তাঁরা আসবার পথে এক ধারে নদীর উচু পাড় দেখে এসেছে। সেখানে কোনো রকমে কবর হতে পারে। এমন কি নৌকায় করে কাঠ কেরসিন নিয়ে গিয়ে আগুনও জ্বালনো যেতে পারে। দুজন আলাদা হয়ে ভিড় ভেঙে দুশ্চিন্তিত মানুষকে জানাল নেই উঁচু পাড়ের কথা। রাত নামার আসার আগেই কাজ শেষ করা চাই। বামুনঠাকুরের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ। মুয়াজ্জিন সাহেবেরও গোসল, জানাজা হয়ে গেছে। সারি সারি নৌকায় সেই উচু যায়গার পথ ধরল দুই দল। একদল জপছে হরির নাম আর অন্য দল জপছে আল্লাহর নাম।
বৃষ্টি ধরে এসেছে। ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল মুয়াজ্জিন সাহেবের মৃত দেহ। কবর খোড়া হলো। বালু, মাটি, বাঁশ, চট দিয়ে কোনোরকমে কবরের সুরত রাখা গেল। সেখানে রাখা হল মুয়াজ্জেনের নিথর দেহ। কর্দমাক্ত মাটিতে শক্ত পোক্ত ভাবে কবর দেয়া হল। পাশাপাশি চলল শবদাহের প্রস্তুতি। বৃষ্টি বাঁচিয়ে কাঠে কেরসিন ঢেলে তৈরি হলো চিতা। শুইয়ে দেয়া হল বামুন ঠাকুরকে । বামুন ঠাকুরের বড় ছেলে এসে শবের মুখে আগুন দিলো।
কবর ও দাহকার্য শেষে যার যার মতো সবাই প্রার্থনায়। কেউ চাইলো মৃতের জন্য বেহেশত, কেউ চাইলো স্বর্গ।
দীপ আর এমরান তখন পাশাপাশি বসে। বেহেস্ত আর স্বর্গও কি তবে পাশাপাশি? দুজন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নীরবে হয়ত এই কথাই ভেবে চলেছে।
- বিষয় :
- শ্মশান
- দুর্গাপূজা