যুক্তরাষ্ট্রে ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে দক্ষিণ কোরিয়া, ঘোষণা ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
রয়টার্স
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:১৮
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে দক্ষিণ কোরিয়া। বুধবার এ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন তিনি। তবে সিউল জানিয়েছে, পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ আলাস্কার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্পের জন্য ৫৪ বিলিয়ন ডলারের পাইপলাইন নির্মাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
হোয়াইট হাউসের ঘোষণাটি গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় নেওয়া ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির অংশ। এর মধ্যে জাহাজ নির্মাণ খাতে ১৫০ বিলিয়ন ডলার এবং কৌশলগত বিনিয়োগের জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা রয়েছে।
ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে তার প্রশাসনের করা চুক্তির আওতায় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে ২০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করবে। তিনি জানান, এই বিনিয়োগের আওতায় আটটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইপলাইন এবং টেক্সাসে ছয় গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প যেসব অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ চুক্তিকে সামনে আনছেন, এই ঘোষণা তার অন্যতম। ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের মধ্যে নিজের প্রশাসনের অর্থনৈতিক সাফল্য তুলে ধরতেই তিনি এসব উদ্যোগ সামনে আনছেন।
আলাস্কার পাইপলাইন প্রকল্পটির রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। সেখানে রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলারার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বুধবারের ঘোষণার অনুষ্ঠানে সুলিভানও উপস্থিত ছিলেন।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার জানিয়েছে, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ও আইনি শর্ত পূরণ হলেই কেবল পাইপলাইন প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হবে। সিউল ট্রাম্পের ঘোষণার অন্যান্য বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডাটা সেন্টারে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য টেক্সাসের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ২২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং আটটি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে ১২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আলাস্কা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য যাচাইয়ের কাজ শুরু করবে তারা। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ করা হবে কি না কিংবা বিনিয়োগের পরিমাণ কত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্প এবং পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এসব প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
আলাস্কা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নর্থ স্লোপ থেকে আলাস্কার দক্ষিণ উপকূলে একটি গ্যাস তরলীকরণ কেন্দ্রে প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য ৮০৭ মাইল দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। সেখান থেকে এশিয়ার বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন এবং বছরে সর্বোচ্চ ২ কোটি মেট্রিক টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রপ্তানি বাড়ানো এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের একটি উপায় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে প্রকল্পটির ব্যয়, অর্থায়ন এবং বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে জানিয়েছিল, ২০০ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত বিনিয়োগ কর্মসূচির আওতায় প্রথম প্রকল্প হিসেবে টেক্সাসের এনসিনালে ছয় গিগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্বাচন করা হয়েছে।
জাপানের দুটি বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জেরা ও টোকিও গ্যাস আলাস্কা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেখান থেকে বছরে সম্মিলিতভাবে ২০ লাখ মেট্রিক টন গ্যাস কেনার বিষয়ে প্রাথমিক চুক্তি করেছে।
প্রকল্পটির উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান গ্লেনফার্ন ট্রাম্পের বিনিয়োগ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বছরে ১ কোটি ৩০ লাখ মেট্রিক টন গ্যাস কেনার প্রতিশ্রুতি বা নিশ্চয়তা ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। তবে চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং এসব প্রতিশ্রুতিকে বাধ্যতামূলক করতে আরও ৩০ লাখ মেট্রিক টনের প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
গ্লেনফার্ন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিনিয়োগ কাঠামো চূড়ান্ত করতে এবং চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় বাকি পদক্ষেপগুলো সম্পন্ন করতে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের সঙ্গে কাজ করবে।
ডাটা সেন্টার ও উৎপাদন খাতের মতো বিদ্যুৎনির্ভর খাতে চাহিদা বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই আটটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া বৃহত্তর বিনিয়োগ প্যাকেজের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পারমাণবিক প্রকল্পে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
টেক্সাসের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি অর্ধপরিবাহী কারখানা ও তথ্যকেন্দ্রের মতো বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইয়ের পরই প্রকল্পটি নির্বাচন করা হয়েছে।