এক্সপ্লেইনার
ক্রিস্টা পাইক: প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলে কী ঘটে?
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্রিস্টা পাইক। প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের পরও তিনি বেঁচে গেছেন। ছবি: সংগৃহীত
আল জাজিরা
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:১৪ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:৫৯
প্রাণঘাতী ইনজেকশনের দুটি ডোজ প্রয়োগের পরও ক্রিস্টা গেইল পাইক মারা যাননি। প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার ৫০ বছর বয়সী এই নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। কিন্তু ইনজেকশন প্রয়োগের পরও তাঁর হৃদস্পন্দন বন্ধ না হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওই চেষ্টা হয়েছে টেনেসি অঙ্গরাজ্যে। সেখানে গত ২০০ বছরে কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। পাইক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সেলে থাকা একমাত্র নারী।
বুধবার শেষ মুহূর্তে ফেডারেল আপিল আদালত পাইকের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই স্থগিতাদেশ বাতিল করেন। এরপর পেন্টোবারবিটাল নামক চেতনানাশক ইনজেকশন প্রয়োগ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা চালানো হয়। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টা প্রমাণ করে, এই শাস্তি কতটা অমানবিক। তাই প্রথাটি পুরোপুরি বাতিল করা উচিত।
কুখ্যাত গুয়ানতানামো বে কারাগারের বন্দিদের আইনি সহায়তা দিয়েছিলেন মানবাধিকার আইনজীবী ক্লাইভ স্টাফোর্ড স্মিথ। তিনি বলেন, ‘আমি ছয়জন মক্কেলের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কক্ষে (এক্সিকিউশন চেম্বার) থেকেছি। বাইরে থেকে প্রক্রিয়াটিকে যতটা নিখুঁত বলা হয়, আসলে এটি তেমন নয়।’

স্মিথ আরও বলেন, ‘এই শাস্তি কি বিশ্বকে আরও ভালো বা সভ্য করে তুলছে? মানুষ হত্যা যে অপরাধ, সেটি প্রমাণ করার জন্য আমরা কেন আরেকজন মানুষকে হত্যা করি?’
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওই উদ্যোগের আগে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম টাইমসকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন মরিস টিডবল-বিনজ। তিনি জাতিসংঘের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক বিশেষ দূত। মরিস বলেন, ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে, তিনি মূলত নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার শিকার হবেন। এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
ক্রিস্টার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়াটি যখন ব্যর্থ হয়, তখন আসলে কী ঘটেছিল? এ নিয়ে যেসব তথ্য জানা গেছে তা তুলে ধরা হলো।
পাইক কোন মামলার আসামি?
অন্য এক তরুণীকে হত্যার দায়ে ৩০ বছর আগে দোষী সাব্যস্ত হন ক্রিস্টা পাইক। প্রেমের ক্ষেত্রে ওই তরুণীকে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করতেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর।

পাইক যাকে হত্যা করেছেন তাঁর নাম কলিন স্লেমার (১৯)। প্রায় ৩০ বছর আগে ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাসে কলিনকে একটি জঙ্গলে ডেকে নেন পাইক। সেখানে পাইকের প্রেমিক তাডারিল শিপ (১৭) ও শ্যাডোলা পিটারসন (১৮) নামে আরেকজন ছিলেন।
কলিনকে হত্যার ঘটনাটি তখন বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। পাইক নিজে কলিনের মাথায় প্রাণঘাতী আঘাত ও খুলি গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি হত্যার পর তিনি মাথার খুলির একটি টুকরা নিজের কাছে রেখে দেন।
মামলার পর পাইক ও শিপ নিজেদের দোষ স্বীকার করেন। ১৯৯৬ সালে তারা হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিশোর বয়সের কারণে শিপকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত।
পাইকের আইনজীবীদের দাবি, ক্রিস্টা এখন ৫০ বছর বয়সী একজন অনুতপ্ত নারী। তিনি নিজের কাজের পরিণতি বুঝতে পেরেছেন। ছোটবেলায় নিজেও দুইবার ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন।
মানবাধিকার আইনজীবী স্টাফোর্ড স্মিথ বলেন, ঘটনার সময় পাইক কিশোরী ছিলেন। এখন তাঁর বয়স ৫০ এবং ভিন্ন এক মানুষ। ফলে এই মৃত্যুদণ্ড একেবারেই অর্থহীন।
তবে পাইক যাকে হত্যা করেছেন, সেই কলিনের মা মে মার্টিনেজ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষে কথা বলেছেন।
প্রাণঘাতী ইনজেকশনের বদলে কেবল নারীদের নিয়ে গঠিত ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে নিজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন করেছিলেন পাইক। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ইনজেকশন প্রয়োগের বিষয়টি অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে, তিনি ভয় পাচ্ছেন। কিন্তু সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় কী ঘটেছিল?
টেনেসির ন্যাশভিলে অবস্থিত রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা হয়। তাঁকে পেন্টোবারবিটাল নামে চেতনানাশকের দুটি ডোজ দেওয়া হয়েছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী ও বার্তা সংস্থা এপির সাংবাদিক কিম চ্যান্ডলার বলেন, ইনজেকশন দেওয়ার পর প্রাথমিকভাবে পাইককে বেশ সজাগ দেখাচ্ছিল। কয়েকবার তাঁর (পাইকের) মুখ হা হয়ে গিয়েছিল। তিনি জোরে জোরে নাক ডাকতে শুরু করেন। কয়েকবার হাঁসফাঁসও করছিলেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া কেন সম্পন্ন করা যায়নি, তা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি টেনেসির ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশন। এনবিসি নিউজের খবর অনুযায়ী, বুধবার গভীর রাতে পাইকের আইনজীবীরা ফেডারেল আদালতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিতের জন্য আবেদন করেছেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়াটি কেন ব্যর্থ হলো?
টেনেসির কর্তৃপক্ষ এখনো এর কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে মানবাধিকার আইনজীবী স্টাফোর্ড স্মিথ সম্ভাব্য দুটি কারণ জানিয়েছেন।
স্মিথ বলেন, ‘প্রথমত, ওষুধগুলো সম্ভবত মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। গত ১০ বছর ধরে আমরা প্রায়ই এমনটা দেখছি। তারা এমন ওষুধ প্রয়োগ করে, যেগুলোর আর কোনো কার্যকারিতা থাকে না।’

পাইকের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় কাজ করেছে বলে মনে করেন স্মিথ। তিনি বলেন, পাইকের মতো শৈশবে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের মাদকাসক্তির ইতিহাস থাকে। তাদের শিরা খুঁজে বের করে সুই ফোটানো অনেক কঠিন কাজ। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকদের অংশ নেওয়ার অনুমতি নেই। ফলে অদক্ষ লোকজনই ওষুধ পুশ করে। এটি ইনজেকশন ব্যর্থ হওয়ার কারণ হতে পারে।
টেনেসির ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশন এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় অনুমোদিত সব বৈধ ও প্রতিষ্ঠিত নিয়ম (প্রটোকল) অনুসরণ করেছে। প্রাণঘাতী ইনজেকশনটি বরাবরই কার্যকর। প্রটোকল অনুযায়ী এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই।
এরপর পাইকের কী হবে?
এই মুহূর্তে বিষয়টি একেবারেই অস্পষ্ট। পাইকের ঘটনাটির পর এক বিশেষ আদেশ দিয়েছেন টেনেসির গভর্নর বিল লি। এর আওতায় চলতি বছর যেসব মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল সেগুলো স্থগিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি বিষয়টি নিয়ে তৃতীয় পক্ষের পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন।
বর্তমানে পাইক কারাগারের বাইরের একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তিনি হয়তো আবারও ডেথ রো-তে (মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সেল) ফিরে যেতে পারেন। তবে আইনজীবী স্টাফোর্ড স্মিথ জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
এমন ঘটনা কি আগেও ঘটেছে?
আইনবিশারদ অস্টিন সারাত ও ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ব্যর্থতার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তবে পদ্ধতি অনুযায়ী হার ভিন্ন হয়।
অস্টিন সারাত তাঁর বই ‘গ্রুসাম স্পেকটাকলস: বচড এক্সিকিউশনস অ্যান্ড আমেরিকাস ডেথ পেনাল্টি’-তে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৮৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ৮ হাজার ৭৭৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর মধ্যে ২৭৬ জনের (৩.১৫ শতাংশ) ক্ষেত্রে কোনো না কোনো ত্রুটি দেখা দিয়েছিল।
সারাত আরও জানান, ওই সময়ে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ব্যর্থতার হার সবচেয়ে বেশি (৭.২ শতাংশ) ছিল।
মানবাধিকার আইনজীবী স্টাফোর্ড স্মিথ বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে এমন ব্যর্থতার ঘটনা অনেকবারই ঘটেছে। এটি মূলত অত্যন্ত বাজে লোকদের দ্বারা পরিচালিত একটি অসভ্য প্রক্রিয়া।
- বিষয় :
- মৃত্যুদণ্ড
- যুক্তরাষ্ট্র