হুতিদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ইয়েমেনি সেনার সমন্বয়ে অভিযানের পরিকল্পনা সৌদির, সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ
ছবি: রয়টার্স
রয়টার্স
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩৪ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১৩
লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব থেকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে ইয়েমেনে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব। অভিযানে প্রায় এক লাখ বা তারও বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। এ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। পাশাপাশি কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে রয়টার্স।
প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত ছয়জন ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। অভিযানের সম্মুখভাগে থাকবে ইয়েমেনি বাহিনী, যাদের কার্যক্রম রিয়াদ তদারকি করছে। তাদের সহায়তায় সৌদি আরব বিমান হামলা চালাবে।
নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনার জন্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। এর মধ্যে লক্ষ্যবস্তুসংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ সৌদি আরবকে মূলত আত্মরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে সৌদির মিত্ররা সরাসরি কোনো যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সৌদি আরবের পরিকল্পিত অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হলো হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। উপসাগরীয় ও ইয়েমেনি কর্মকর্তা এবং পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, গত মাসে হুতিরা উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
অভিযানের জন্য সৌদি আরব দুটি সম্ভাব্য বিকল্প বিবেচনা করছে। এর একটি হলো বাব আল-মান্দেবের আশপাশে সুনির্দিষ্ট ও সীমিত পরিসরের হামলা। অন্যটি হলো আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে একই সময়ে একাধিক হামলা চালিয়ে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযানের পরিসরের ওপর নির্ভর করে এতে এক লাখেরও বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন করা হতে পারে।
সৌদি ও ইয়েমেনি সরকার, হুতি গোষ্ঠী এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্ররা সৌদি পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেননি।
বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণ দিকের বহির্গমনপথ এবং ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চলাচলের রুট। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ বছর এই নৌপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের মতে, বাব আল-মান্দেব হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে ইয়েমেন নিয়ে নতুন করে শান্তি আলোচনা করা কঠিন বলে মনে করছে রিয়াদ।
তবে অভিযান শুরুর সুনির্দিষ্ট সময় এখনো জানা যায়নি। প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত ছয়জন ব্যক্তির কেউই নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি। তাদের ধারণা, এক সপ্তাহের মধ্যে অথবা নভেম্বরের শুরুতে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর অভিযান শুরু হতে পারে।
সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি আশা প্রকাশ করেছেন, অভিযানটি সীমিত পরিসরের হবে। তার মতে, ২০১৫ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় এবারের অভিযান অনেক ছোট হতে পারে। তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকা পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক সামুদ্রিক চলাচল ফিরিয়ে আনাই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে একটি আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে দেশটির গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সৌদি আরব। ২০২২ সালে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। হুতিরা সৌদি আরবের জাহাজ ও তেল অবকাঠামোয় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনে সৌদি বিমান অভিযানে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপদেষ্টা ও গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন এক পশ্চিমা কূটনীতিক। তবে সৌদি আরবের কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে বিমান হামলার মতো সরাসরি সামরিক সহায়তার অনুরোধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে এর আগে জানিয়েছিল রয়টার্স।
এদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানও সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। গত মাসে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে দেশ দুটি। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত মাসে চারটি কার্গো বিমানে করে এডেনে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইয়েমেনি বাহিনীকে সহায়তা করতে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও সেখানে রয়েছেন। সৌদি আরব আগে কেনা তুরস্কের ড্রোনও ইয়েমেনে মোতায়েন করেছে।
ইয়েমেনে নতুন অভিযান শুরু হলে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো রক্ষা করাও রিয়াদের অন্যতম উদ্বেগ। এ জন্য সৌদি আরব কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে। সৌদি আরবের স্থলসীমান্ত রক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পাকিস্তান দেশটিতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে। তবে ইসলামাবাদ জানিয়েছে, এসব সৈন্যকে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য পাঠানো হয়নি।
সৌদি আরবকে দেওয়া সামরিক সহায়তা নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি। এদিকে লোহিত সাগরের তীরবর্তী বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় সৌদি আরবকে সহায়তা করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।
তবে ইয়েমেনে স্থল অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে সৌদি আরবকে স্থানীয় বাহিনীগুলোর বিভক্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে বিভিন্ন ইয়েমেনি বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছিল।
ইয়েমেন বিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা বলেন, হুতিদের মতো সুসংগঠিত বাহিনীকে পিছু হটাতে দীর্ঘস্থায়ী ও ধারাবাহিক আক্রমণ প্রয়োজন। কিন্তু হুতিবিরোধী অনেক বাহিনী এখনো সেই ধরনের অভিযানের জন্য পুরোপুরি সংগঠিত বা প্রস্তুত নয়।
গত শীতে ইয়েমেনি বাহিনীর বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়। সে সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চীয় যোদ্ধারা পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকা দখলের চেষ্টা চালিয়ে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। ধারাবাহিক সংঘর্ষের পর তারা সৌদি-সমর্থিত যোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হয়।
সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলি শিহাবি বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানের সাফল্য অনেকাংশে স্থলবাহিনীর কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে। তার মতে, এতদিন সৌদির অগ্রাধিকার ছিল নিজেদের অবস্থান রক্ষা ও রণাঙ্গনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তবে এখন তারা আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের দিকে যাচ্ছে।
- বিষয় :
- অভিযান
- লোহিত সাগর
- সৌদি আরব
- যুক্তরাষ্ট্র
- হুতি