ফ্লাইদুবাইয়ে অভিযুক্ত হামলাকারী কে, জানা গেল তার পরিচয়
অবতরণের পর টারমাকে থাকা ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ উড়োজাহাজ। ছবি: এএফপি
আল জাজিরা
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩১
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে ক্যাপ্টেনের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে সহকারী পাইলটের বিরুদ্ধে। গত বুধবারের ওই ঘটনায় উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সহকারী পাইলটের পরিচয়, তার অতীত পেশাজীবন ও কথিত উগ্রবাদী মতাদর্শ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
আমিরাতের কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল, অভিযুক্ত পাইলট একাই এ কাজ করেছেন কি না কিংবা কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।
অভিযুক্ত সহকারী পাইলট কে
ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। হামলার অভিযোগে সন্দেহভাজন সহকারী পাইলটের নাম হামাম আল-হাম্মামি। তিনি ওমানের নাগরিক বলে জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি। তাদের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন কূটনীতিক ও একজন পশ্চিমা কূটনীতিক রয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যক্তিরা সংবাদমাধ্যমকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তাদের একজনের ভাষ্য, তদন্তের অন্যতম বিষয় হলো আল-হাম্মামি একাই হামলা চালিয়েছিলেন কি না, নাকি কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল।
সিএনএনও একটি সূত্র ও ইসরায়েলের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আল-হাম্মামি ওমানের নাগরিক। তার জন্ম অবশ্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তার মা সিরিয়ার নাগরিক। জীবনের কয়েক বছর তিনি আমিরাতেই কাটিয়েছেন।
অভিযুক্ত পাইলটের আগের পেশাজীবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগে তার বিষয়ে কোনো সতর্কসংকেত ছিল কি না, তা এখন তদন্তের অংশ হয়ে উঠেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ওমানের কর্তৃপক্ষ একসময় আল-হাম্মামিকে দেশটিতে উড়োজাহাজ চালানো থেকে নিষিদ্ধ করেছিল। কথিত উগ্রবাদী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগের কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে তার কথিত মতাদর্শের ধরন কী ছিল, তা স্পষ্ট নয়। ওমানের কর্তৃপক্ষ ওই উদ্বেগের কথা অন্য কোনো দেশ বা বিমান সংস্থাকে জানিয়েছিল কি না, সেটিও জানা যায়নি।
সিএনএনের আরেক প্রতিবেদনে আঞ্চলিক এক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, একই ধরনের উদ্বেগের কারণে আল-হাম্মামিকে একসময় উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাকে অন্য একটি পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আল-হাম্মামির নামে একটি লিংকডইন প্রোফাইল থাকার কথাও জানিয়েছে সিএনএন। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি সাত বছর ওমান এয়ারে কাজ করেছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ওই প্রতিষ্ঠান ছাড়েন। একই বছরের জুনে তিনি রয়্যাল এয়ার মারোক-এ যোগ দেন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেখান থেকেও চলে যান।
ফ্লাইটে কী ঘটেছিল
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫ মিনিটে দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এফজেড১০৭৩। উড়োজাহাজটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠার পর হঠাৎ দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে।
প্রায় দুই মিনিটে উড়োজাহাজটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে যায়। পরে আবার ওপরে ওঠে এবং আবার নিচে নামতে থাকে।
এই সময় ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয় বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী পাইলট ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিথ মছারকে ছুরিকাঘাত করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় মছার ককপিটের মেঝেতে পড়ে যান। পরে তিনি জানান, উড়োজাহাজটি দ্রুত নিচে নামতে থাকায় তিনি বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তার হাতে খুব কম সময় আছে।
আবুধাবির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলার সময় মছার ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় তিনি ককপিটের দরজার দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন। পরে দরজা খুলতে সক্ষম হলে যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ভেতরে ঢুকে অভিযুক্ত সহকারী পাইলটকে কাবু করেন।
এরপর উড়োজাহাজটি প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় স্থিতিশীল হয়। এর ট্রান্সপন্ডার কোড পরিবর্তন করে ‘৭৫০০’ করা হয়, যা উড়োজাহাজে বেআইনি হস্তক্ষেপের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
উড়োজাহাজে থাকা দুজন রিজার্ভ পাইলট তখন নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে তারা সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটি অবতরণ করান। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই পাইলটকেই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরে চিকিৎসা শেষে তাদের আবুধাবিতে স্থানান্তর করা হয়।
আমিরাতের বক্তব্য
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি বলেছেন, তদন্তে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সহকারী পাইলট ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ শুরু করেছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সহকারী পাইলট ককপিটে জরুরি কাজে ব্যবহৃত একটি বিশেষ কুঠার দিয়ে ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা করেন। এরপর তিনি উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এ ধরনের কুঠার সাধারণত ককপিটে রাখা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে উড়োজাহাজের কাঠামো কেটে বের হওয়ার পথ তৈরিতে এটি ব্যবহার করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার আল-শামসি তদন্তকারীদের ঘটনাটি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। হামলার পেছনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা বের করার পাশাপাশি এর পেছনে আগাম পরিকল্পনা বা কারও নির্দেশনা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে আমিরাত এখনো হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য প্রকাশ করেনি। অভিযুক্ত সহকারী পাইলট একাই হামলা চালিয়েছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করেনি দেশটি।
তদন্তে এখন যেসব প্রশ্ন
বর্তমানে আবুধাবির নেতৃত্বে তদন্ত চলছে। হামলার পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য এবং অভিযুক্ত পাইলটের সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা।
আল-শামসি বলেছেন, ঘটনার বিচারিক এখতিয়ার আমিরাতের বিচার বিভাগের। কারণ, উড়োজাহাজটি আমিরাতে নিবন্ধিত এবং দেশটির পতাকা নিয়ে চলাচল করে। দেশের বাইরে সংঘটিত হলেও উড়োজাহাজে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে আমিরাতের আইন প্রযোজ্য হবে বলে জানান তিনি।
তদন্তকারীরা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কারিগরি পরীক্ষা চালানোর পাশাপাশি বস্তুগত ও ডিজিটাল আলামত পরীক্ষা করছেন। ঘটনার সব পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
তদন্ত শেষ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত ফলাফল জানানো হবে বলে জানিয়েছেন আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল। এদিকে তদন্তের কারণে ইসরায়েলে ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
- বিষয় :
- আরব আমিরাত
- ইসরায়েল
- পাইলট
- পরিচয় শনাক্ত