ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

নাগরিকত্ব বাতিলে রেকর্ডসংখ্যক মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের

নাগরিকত্ব বাতিলে রেকর্ডসংখ্যক মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের
×

ফাইল ছবি: প্যাট্রিক সেমানস্কি/এপি

আল–জাজিরা

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:২৯

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বাতিলের লক্ষ্যে রেকর্ডসংখ্যক মামলা করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এমন কিছু আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন, যেগুলো সাধারণত খুব কমই ব্যবহার করা হয়। এসব আইনের আওতায় অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব বাতিলের সুযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এমন ৪০টি নতুন মামলা করেছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত অভিবাসন-সূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সোমবার এক বিবৃতিতে ফেডারেল কৌঁসুলিরা জানান, অর্থ পাচার, শিশুদের যৌন নির্যাতন, ভিসা জালিয়াতি ও কর ফাঁকির মতো ‘গুরুতর অপরাধে’ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে এত অল্প সময়ে নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য দায়ের করা আবেদনের সংখ্যার দিক থেকে এই ৪০টি মামলা সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। আগস্টের শেষভাগ থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত এসব মামলা দায়ের করা হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, আজকের এই ঘোষণা আধুনিক ইতিহাসে নাগরিকত্ব বাতিলের সবচেয়ে বড় উদ্যোগকে চিহ্নিত করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে বিচার বিভাগ জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং আমেরিকান জনগণকে সুরক্ষার স্বার্থে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়াটি ব্যবহার অব্যাহত রাখবে।

সোমবারের ঘোষণায় যাদের নাগরিকত্ব বাতিলের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই ৪০ জনের মধ্যে মেক্সিকো, পাকিস্তান, চীন ও সিয়েরা লিওনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য তথ্য গোপন করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তবে তাদের বিরুদ্ধে করা কিছু অভিযোগের ঘটনা নাগরিকত্বের শপথ নেওয়ার পর ঘটেছে।

তালিকায় থাকা দুজনের বিরুদ্ধে চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, নাগরিক হওয়ার আগেই এসব অপরাধ সংঘটিত করার অর্থ হলো ওই ব্যক্তিদের ‘উত্তম নৈতিক চরিত্র’ ছিল না এবং তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বাতিলের আইন কয়েক দশক ধরেই প্রচলিত। তবে ঐতিহাসিকভাবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেই এ আইন প্রয়োগ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন সরকার এমন অনেক নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে হলোকাস্টে জড়িত থাকার তথ্য গোপন করা বা যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত থাকার অভিযোগ ছিল।

উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা এমা গোল্ডম্যানের। লিথুয়ানিয়ায় জন্ম নেওয়া এই নৈরাজ্যবাদী ও নারী অধিকারকর্মী যুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য ১৯১৭ সালে কারাবরণ করেন। পরে তার নাগরিকত্ব বাতিল করে সোভিয়েত ইউনিয়নে নির্বাসিত করা হয়। তবে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর থেকে এ ধরনের পদক্ষেপের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

এখন ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বৃহত্তম নির্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন।

মার্কিন আইন অনুযায়ী, সরকারি কৌঁসুলিরা আদালতে এমন ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করতে পারেন, যারা দেশের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং নাগরিকত্বের আবেদনের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ গোপন করেছেন। ওই তথ্য জানা থাকলে তাঁদের আবেদন অযোগ্য বলে বিবেচিত হতো— এমন ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করা যায়।

তবে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া সম্প্রসারণের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাদের যুক্তি, এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়তে পারেন।

সমালোচকেরা আরও সতর্ক করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়টিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত বছর মিনেসোটায় সোমালি অভিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ডে-কেয়ার বা শিশু-যত্ন কেন্দ্র সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন বিপুলসংখ্যক সোমালি-আমেরিকানের নাগরিকত্ব বাতিলের ইঙ্গিত দিয়েছিল। সে সময় ট্রাম্প সোমালিয়ায় তাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলেছিলেন।

এ ছাড়া ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য অ্যান্ডি ওগলস নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির নাগরিকত্ব বাতিলের সম্ভাবনার কথাও তুলেছিলেন। মামদানি উগান্ডায় জন্মগ্রহণ করেছেন। ট্রাম্পও ভিত্তিহীনভাবে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে মামদানি হয়তো অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।

২০২৫ সালে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও উপদেষ্টা ইলন মাস্কের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার পর ট্রাম্প তাঁর নাগরিকত্ব বাতিলের ধারণার কথাও বলেছিলেন।

ট্রাম্প জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রথা বাতিলের জন্যও জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এই প্রথার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী প্রায় সব শিশুই নাগরিকত্ব পায়। কূটনীতিক ও বিদেশি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সন্তানদের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সুরক্ষিত। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অর্জিত নাগরিকত্বের মতো এটি বাতিল করা যায় না।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ব্যবস্থা সীমিত করার লক্ষ্যে ট্রাম্পের নেওয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রায় দেয়। তবে প্রেসিডেন্ট আরেকটি নির্বাহী আদেশ জারি করে এই নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়া সীমিত করার চেষ্টা করায় বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

আরও পড়ুন

×