এক্সপ্লেইনার
বঙ্গোপসাগর কেন পরাশক্তিদের সংঘাতের কেন্দ্র হতে পারে?
কৌশলগত কারণে পরাশক্তিদের কাছে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বেড়েছে। ছবি: দ্য হিন্দুর সৌজন্যে
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:১২ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:২১
ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি সংলাপ থেকে বঙ্গোপসাগর নিয়ে দুটি বার্তা সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো এই সমুদ্র অঞ্চল। অপরদিকে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবরের মতে, তাইওয়ান সংকট ও পরাশক্তির আধিপত্যের জেরে বঙ্গোপসাগর ভূরাজনৈতিক সংঘাতের পরবর্তী কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সংঘাতের আশঙ্কার এমন বিপরীতমুখী অবস্থানে সাগরটি এখন কূটনীতির ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, বঙ্গোপসাগর কেন পরাশক্তিদের সংঘাতের কেন্দ্র হতে পারে? সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নে দরকষাকষির টেবিলে বাংলাদেশের ‘বার্গেনিং চিপ’ বা মূল শক্তি কী হবে?
বঙ্গোপসাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দক্ষিণ এশিয়ায় বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরের একটি বিস্তৃত অংশ। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন দেশ নতুন করে অঞ্চলটি ঘিরে কৌশল সাজাচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের ৯৫ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য ভারত মহাসাগর দিয়ে পরিচালিত হয়। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ৭০ শতাংশের বেশি। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বঙ্গোপসাগরের পরিবহন পথ বা ট্রানজিট রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন অন্যতম অগ্রাধিকার।
ভৌগোলিকভাবে বঙ্গোপসাগরের উত্তরে বাংলাদেশ, পূর্বে মিয়ানমার, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, মালয় উপদ্বীপের একাংশ এবং পশ্চিমে ভারত ও শ্রীলঙ্কা অবস্থিত। অববাহিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আছে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড।
তীরবর্তী দেশগুলোর কে কী করছে?
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত চলছে। কিন্তু এই গৃহযুদ্ধ শুধু তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট তৈরি করেছে।
এই অববাহিকায় সাতটি দেশের মধ্যে তিনটিই বৈশ্বিক বাণিজ্যের কৌশলগত জলপথ মালাক্কা প্রণালির খুব কাছাকাছি। সেখানে ভারত নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বার্তা সংস্থা এএফপির গত মে মাসের এক বলা হয়, মালাক্কার কাছাকাছি অবস্থিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও উপশহর গড়ে তোলা হচ্ছে। এক ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বন্দরটি কৌশলগত, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এটি ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় জল ও আকাশপথে যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত হবে।

ভারতের এ উদ্যোগকে অনেকে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন। কৌশলটির আওতায় বেইজিং ভারত মহাসাগরসহ বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী দেশগুলোর বাণিজ্যিক স্থাপনায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। গত এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির পর দেশটির আকাশসীমা দিয়ে সামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের অনুমতি চেয়েছিল ওয়াশিংটন। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে, ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করবে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ‘লং গেম’
বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে চীন এবং উদীয়মান এশীয় অর্থনীতিগুলোর উত্থান ঘটে। এর ফলে কৌশলগত ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভরকেন্দ্র এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে সরে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র এখানে তাদের ‘অবাধ ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল’ কৌশল নিয়ে কাজ করছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ এ অঞ্চলে বসবাস করে। এছাড়া, তিনটি শীর্ষ অর্থনীতি, পাঁচটি জনবহুল ও চারটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশও এখানে অবস্থিত।
প্রতিরক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেখা হয়েছে, এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্বের শিল্প ইঞ্জিনকে সচল রেখেছে। ফলে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিরল সম্পদের দখল নেওয়ার লড়াই তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে মেরিটাইম সিল্ক রোড ও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়নে চীন বঙ্গোপসাগরকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে। এর লক্ষ্য হলো প্রশান্ত মহাসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ পথগুলো এড়িয়ে নিজেদের ‘টু-ওশান স্ট্র্যাটেজি’ সুরক্ষিত রাখা।
ভারতও বঙ্গোপসাগরকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাফার জোন (নিরাপদ বলয়) হিসেবে দেখে। চীনের প্রভাব মোকাবিলায় তারা ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি গ্রহণ করেছে, যা শুরুতে অর্থনৈতিক উদ্যোগ হলেও এখন রাজনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা পেয়েছে।
জাপানও আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে এই প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে। তাদের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগের আওতায় কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হচ্ছে। জাইকার মতে, এটি দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করবে।
‘সংঘাতের শঙ্কা’, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কৃষ্ণসাগর, কাস্পিয়ান ও ভূমধ্যসাগরে উত্তেজনা দেখা গেছে। বর্তমানে আরব ও লোহিত সাগর ঘিরে সংঘাত চলছে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর সতর্ক করেছেন, কৌশলগত অঞ্চলে এমন সংঘাতের ধারাবাহিকতা ভারত মহাসাগরসহ বঙ্গোপসাগরেও দেখা যেতে পারে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এ গত রোববার এম আকবর বলেন, তাইওয়ান সংকট তীব্র হলে মালাক্কা প্রণালি সেই সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হতে পারে।

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের অন্যতম বড় নিরাপত্তা সহযোগী। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৭ সালের মধ্যে দ্বীপ দেশটি দখলে নিতে সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
নেদারল্যান্ডসের ডেলফট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক ইয়াসপার ফেরসখুর বলেন, দক্ষিণ চীন সাগর, পূর্ব চীন সাগর ও মালাক্কা প্রণালির মতো পথগুলো বেইজিং-ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। এসব সামুদ্রিক পথ কেবল বাণিজ্যের জন্যই নয়, সামরিক প্রভাব বিস্তারের জন্যও জরুরি।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক সাময়িকী ‘থিংক চায়না’য় প্রকাশিত এক নিবন্ধে ফেরসুখর লিখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালির মতো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও উত্তেজনা দেখা দিলে কৌশলগত রুটের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি বাড়বে।’ অর্থাৎ, তাইওয়ান ঘিরে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার ঢেউ মালাক্কা প্রণালি হয়ে বঙ্গোপসাগরেও আছড়ে পড়তে পারে।

চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ভারত মহাসাগরে সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট খুলে দিতে পারে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি হুমকি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা করলে যুদ্ধ ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের ‘বার্গেনিং চিপ’ কী?
ঢাকা ছাড়াও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন, দিল্লি ও বেইজিংয়ের আলাদা স্বার্থ আছে। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার এর কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
২০২৪ সালের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চীনের কাছে মিয়ানমার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে (সেভেন সিস্টার্স) প্রবেশাধিকারের জন্য রাখাইনে কালাদান প্রকল্পের ওপর জোর দিচ্ছে। নিজেদের এসব স্বার্থের কারণে প্রতিবেশীরা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখেনি।

সোমবার শেষ হওয়া বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই হতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো- পরাশক্তিদের সামরিক রেষারেষির মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজছে এবং বঙ্গোপসাগরকে ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে ঢাকা ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ অনুসরণ করছে। কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের দিকে না ঝুঁকে, সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সব অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতে চায়। তবে পরাশক্তিদের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দিনে বঙ্গোপসাগর ঘিরে স্নায়ুযুদ্ধ আরও তীব্র হবে। এই বহুমুখী ভূরাজনৈতিক চাপ সামাল দিয়ে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সুনীল অর্থনীতির কৌশল বাস্তবায়ন করাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা।