ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

এক্সপ্লেইনার

মিয়ানমার নীতিতে মালয়েশিয়া কেন ‘ইউ-টার্ন’ নিচ্ছে?

মিয়ানমার নীতিতে মালয়েশিয়া কেন ‘ইউ-টার্ন’ নিচ্ছে?
×
×

গণহত্যায় অভিযুক্ত মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংকে লালগালিচা বিছিয়ে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। বৃহস্পতিবার পুত্রজায়ায়। ছবি: এএফপি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:২৬ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:২০

মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি জানাতে এক সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। কিন্তু বৃহস্পতিবার তিনি রোহিঙ্গা গণহত্যায় অভিযুক্ত এক নেতাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছেন।

প্রত্যাবাসন কর্মসূচির আওতায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। সেটি নিয়ে আলোচনা করতে মালয়েশিয়া গেছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। দুইদিনের সফরে বিমানবন্দরে তাঁকে লালগালিচা বিছিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

২০১৭ সালে মিন অংয়ের নির্দেশে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক সেনা অভিযান চালানো হয়। তখন তিনি সামরিক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। এতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। তাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা। তারপরও গত রোববার প্রথম দফায় দেড় হাজার অভিবাসীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, মালয়েশিয়া এখন কেন রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছে? 

মালয়েশিয়া কত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে?
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মিয়ানমারের ১ লাখ ৯০ হাজার শরণার্থী মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য। প্রত্যাবাসন কর্মসূচির আওতায় গত রোববার প্রথম দফায় মালয়েশিয়া থেকে প্রায় দেড় হাজার অভিবাসীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। 

এ দফায় মিয়ানমারে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা সেটি স্পষ্ট নয়। দুই দেশের পক্ষ থেকে সংখ্যা জানানো হয়নি। গত মাসে প্রত্যাবাসন উদ্যোগের কথা যখন আলোচনায় আসে তখন একটি বিবৃতি দিয়েছিল মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেখানে শুধু ‘বাস্তুচ্যুত নিজ নাগরিকদের’ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে দেশে ফেরা নিশ্চিতের কথা উল্লেখ করা হয়।

মিয়ানমার জানিয়েছে, চলতি বছর এ পর্যন্ত আকাশপথে প্রায় ৮ হাজার এবং সমুদ্রপথে দেড় হাজার নাগরিককে ফেরত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া ঘোষণা দিয়েছে, তারা আরও সাড়ে ৩ হাজার অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এখন কেন ফেরত পাঠাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আশ্রয় নেওয়া বিশাল জনগোষ্ঠী মালয়েশিয়ার ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে চাপে থাকা আনোয়ার ইব্রাহিমও রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চাইছেন। তাই প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তিনি মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানিয়েছেন।

নির্বাচনের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বৈরিতা ও নাগরিকদের ক্ষোভ মালয়েশিয়ার অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

রোহিঙ্গাদের প্রতি মালয়েশিয়ার নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি করোনা মহামারির সময় থেকে নেতিবাচক হতে শুরু করে। সে সময় এই রোগ ছড়ানোর বিষয়ে নানা ভুল তথ্য ও অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল রোহিঙ্গারা।

মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক খু ইয়াং হুই এএফপিকে বলেন, সেই বৈরিতা ও ক্ষোভ মহামারির পরও রাতারাতি উধাও হয়ে যায়নি। চলতি বছর অনলাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্বেষমূলক প্রচারণার পাশাপাশি হয়রানির ঘটনা অনেক বেড়েছে।

সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের নিয়ে মালয়েশিয়ায় নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেকে দাবি করছেন, অভিবাসীদের কারণে মালয়েশিয়ানরা চাকরি হারাচ্ছেন। এই জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির পাশাপাশি নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে।

অধ্যাপক খু ইয়াং জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের প্রতি মানুষের প্রবল সহানুভূতি ছিল। জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা মুসলিদের প্রতি ধর্মীয় সংহতি ও মানবিক অনুভূতি একাকার হয়ে গিয়েছিল।

তবে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জেমস চিন মনে করেন, বিষয়টি চরম পরিহাসে পরিণত হয়েছে। কারণ, প্রথম দিকে শুধু ইসলামিক সংহতির কারণে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়ায় ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে।

আনোয়ার ইব্রাহিমের কৌশল কী?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণহত্যায় অভিযুক্ত মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানানো এবং অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর উদ্যোগের পেছনে আংশিকভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পালাবদল কাজ করছে।

২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে মালয়েশিয়ায় আঞ্চলিক ও জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনগুলোতে আনোয়ার ইব্রাহিমের জোট ‘পাকাতান হারাপান’ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এসব নির্বাচনে তারা ‘ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)’ নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে হেরেও গেছে। ইউএমএনও সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়দের কাছে থেকে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস-এর জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ইয়াপ লে শেং বলেন, আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রত্যাবাসন উদ্যোগটি জাতিগত মালয়দের ভোট টানার একটি নির্বাচনী কৌশল।

ইয়াপ লে বলেন, মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে আনোয়ার ইব্রাহিম ডানপন্থিদের চেয়ে বেশ পিছিয়ে পড়ছেন। রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদীরা নিজেদেরকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়দের স্বার্থরক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরছে। এমন পরিস্থিতিতে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে আনোয়ার ইব্রাহিমও নিজেকে নাগরিক স্বার্থের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। 

ফিলিস্তিনের মুসলিম বনাম রোহিঙ্গা
অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি হয়তো আনোয়ার ইব্রাহিমের নির্বাচনী সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করবে। কিন্তু মালয়েশিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে ঠেকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মালয়েশিয়ার ভাষণের মাত্র কয়েকদিন পর প্রত্যাবাসনের ঘটনা ঘটেছে। ওই ভাষণে ফিলিস্তিনের মুসলিমদের সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের পক্ষে জোরালো দাবি তুলেছিল কুয়ালালামপুর।

মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খু ইয়াং বলেন, ফিলিস্তিনের বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, মানবিক নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ নিয়ে মালয়েশিয়া অত্যন্ত জোরালো কথা বলে। কিন্তু ঘরের কাছের জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একই নীতি কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেদিকে এখন সবার নজরদারি বাড়বে।

জাতিসংঘ কী বলছে?
মালয়েশিয়ার দাবি, বন্দিশিবিরে থাকা অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে চেয়েছে। 

তবে জাতিসংঘ এই কর্মসূচির কঠোর সমালোচনা করেছে। সংস্থাটি বলছে, প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দেশে ফেরার পর অভিবাসীদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এই কর্মসূচিতে তা নেই।

মালয়েশিয়ার একটি কফি শপে কাজ করার সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৫৩ বছর বয়সী কিয়াও সোয়ার থেইন। গত রোববার দেশে ফেরার পর তিনি এএফপিকে বলেন, দেড় বছরের বেশি সময় কারাবন্দি ছিলেন। সেখানে স্ক্যাবিসে ভুগেছেন। এ কারণে ফিরতে চেয়েছেন। কিন্তু এখন ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে।

২০২১ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন মিন অং হ্লাইং। এর ফলে দেশটি এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে। নতুন করে অস্থিরতা তৈরির পর অনেক নাগরিক বিদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

সামরিক জান্তার আয়োজনে একটি নির্বাচনের পর গত এপ্রিলে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন মিন অং হ্লাইং। তবে এই নির্বাচনটিকে ‘উপহাস’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো।

রোহিঙ্গা নিয়ে মিয়ানমারের দৃষ্টিভঙ্গি এখন কেমন?
মিয়ানমার সরকার ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করতে বিভিন্ন সময় অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে নিজ নাগরিকদের ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি দিলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে অস্বীকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে নেপিডো।

দেশটি দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসীদের বংশধর। 

গত মাসে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যাচাই করা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সহজ করতে বাংলাদেশ ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে মিয়ানমার ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হলেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়ন শুরু হওয়ার পর ২০১৭ সালে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা দেশটি থেকে পালিয়ে যায়। ওই দমন-পীড়নের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গণহত্যার মামলা চলছে। 

(এএফপিতে ৪ সেপ্টেম্বর ও ৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে)

আরও পড়ুন

×