ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার

বিচ্ছিন্নতার অনুভব থেকে ভাষা সৃষ্টির স্বীকৃতি

বিচ্ছিন্নতার অনুভব থেকে ভাষা সৃষ্টির স্বীকৃতি
×
×

কানাডার লেখক অ্যান কারসন। ইলাস্ট্রেশন: নোবেল প্রাইসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

হামিম কামাল

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্পী হওয়া যাদের নিয়তি, প্রকৃতি কি তাদের বিশেষ প্রক্রিয়ার ভেতর বড় করে? হয়তো তাদের মূলের মাটি শিথিল করে দেয়। প্রায় উন্মূল তারা হয়তো জীবনের শুরু থেকেই মাটির ওপর জলের মতো চলেন, যখন তাদের মনের ভাষা তৈরি হচ্ছে। আবার কখনও তাদের দেয় বহুজাতিক পরিবেশ, যেন স্মৃতির ছবিতে ঊনপঞ্চাশ রং লাগে। যে বোধ সৃষ্টি হওয়ার পর মানুষ বিশেষ কোনো কাজে ঝোঁক অনুভব করে; আলাদা দক্ষতা দেখায়, এর কারণ হয়তো এই যে, প্রকৃতি তাকে কোনো একটি শূন্যস্থানে বসাতে চায়; উপযোগ মেটাতে চায়। কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসান– এ বছর সাহিত্যে নোবেল যাঁর হাতে, প্রকৃতি তাঁকে এক ধরনের উন্মূলতার বর দিয়েছিল। ব্যাংকার বাবার কাজের সুবাদে তাঁকে কানাডার কত শহরেরই না ধুলো নিতে হয়েছিল! 

আকাশের সূর্য সবার জন্য সমান। কিন্তু মানুষ যদি স্থানান্তরিত হতে না পারে, সেই সাম্যের দরদ সে বুঝতে পারে না। কোথাও সূর্য অত্যন্ত প্রকট, কোথাও কোমল, কোথাও সে এতখানি অতিথি যে, পৃথিবীর প্রতি তার স্বীকৃতিটুকুও বোঝা কঠিন। এদিকে, মানুষ যে নিগড়গুলো নিজেদের জন্য তৈরি করেছে, সেগুলোর একটি রাষ্ট্র এবং মানুষের অর্থনীতি যে সোনার কারাগার তৈরি করেছে, তার নাম শহর। অ্যান কারসনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা টরন্টোতে। কিন্তু তাঁর মন, ভাষা কেবল টরন্টো নামের সোনার কারাগারে তৈরি হয়নি; বন্দির বিনিময় ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে এবং সেই অবকাশে তাঁর মানুষ পড়ার সুযোগ ঘটেছে। স্টোনি ক্রিকের মতো উপশহরের শিথিল ব্যস্ততা, নিসর্গের চিহ্ন তাঁর হৃদয়ে ছাপ ফেলেছে। আবার টিমিন্সের মতো শিল্পনগরীও তাঁকে দেখিয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সময়ের কানাডীয় বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির চাকা, কাঁটা, অলিন্দ নিলয়। পোর্ট হোপের ঐতিহাসিকতা, হ্যামিলটনে স্নায়ুযুদ্ধের ছাপ পড়া নাগরিক মনন আর সাগরিক আলো মিশেছে তাঁর কৈশোরের সঙ্গে। এই সাগরিক আলোই অ্যানকে প্রস্তুত করেছে, আমার বিশ্বাস। তাঁর বাস্তবের ভূগোলকে আলোকিত করে রেখেছিল সমুদ্রসম এক হ্রদের জল-ফেরানো আলো। মহাসাগর সেখানে পৌরাণিক আবহের সঞ্চার করেছে। এদিকে তাঁর মনের ভূগোলে বোধ করি আলো ছড়িয়েছিল গ্রিক, রোমান পৌরাণিক অতীত। সাগরিক আলো যদি তাঁকে ‘প্রস্তুত’ করে থাকে, তাঁকে ‘নির্মাণ’ করেছে জল– বিপুলা জলাধার, মহাসমুদ্র। পুরাণের উপাসনালয়ে গ্রিক, রোমান ও ইংরেজরা সমুদ্রপূজারী। দূরবর্তী পূর্বজরা হয়তো রক্তে বহন করে তার ইঙ্গিত অ্যান অবধি পৌঁছে দিয়েছিলেন। 

শহর বন্দিশালা এবং শহরবাসী অনুভব করতে পারে– অর্থ ও সমাজবন্ধন মৃত্যুফাঁদও এড়াতে দেয় না। টিমিন্সের বিচ্ছিন্নতা, বিষণ্নতা আমরা অনুমান করতে পারি। উত্তরের সেই বিচ্ছিন্নতার অনুভবই নিশ্চয় অ্যানের মনে সংযোগ গড়ার প্রেরণা এনে দিয়েছিল এবং বিচ্ছিন্নতার নৈঃশব্দ্য অ্যানকে ভাষা সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। 

তাঁর ব্যক্তিত্বের নির্মাণে জলের ভূমিকার কথা এসেছে। এখানে কি সাহিত্যের ভাষা ও অভিব্যক্তির ভুবনে তাঁর একটি নীরব বিদ্রোহের কারণ লুকিয়ে আছে? তাঁর অটোবায়োগ্রাফি অব রেডসহ অপরাপর লেখাতেও পদ্য ও গদ্যের যত্নে বাঁচিয়ে রাখা সীমারেখা ভেঙে পড়তে দেখি ও শুনি। আত্মিক দিক থেকে এই বিদ্রোহ নতুন নয়। এমন উদাহরণ রবীন্দ্রনাথেও আছে। কিন্তু কাঠামোর দিক থেকে অনেকটা নতুন। আধুনিক উপন্যাসের কাঠামো জেমস জয়েস যেভাবে পুনর্নির্মাণ করেছেন; অ্যানকে মনে হয়েছে সেই নির্মিতিতে আরও ব্যাপ্ত করার ক্ষমতাময়ী এক মমতাময়ী উত্তরসূরি। মিখাইল বাখতিন প্রাচীন গীতিকবিতাকে উপন্যাসের প্রারম্ভিক রূপ হিসেবে স্বীকার করেছিলেন। তাত্ত্বিক অনুপ্রেরণার জায়গা থেকে অ্যান হয়তো তাঁরও উত্তরসূরি। আর যদি অ্যানের মতো পুরাণ চষে তাঁর গুরুসন্ধান করি, একজন গুরুমাকে খুঁজে পাব। তিনি কবি সাফো। ঔপন্যাসিক জয়েস, নীতির নির্মাতা বাখতিনের চেয়ে বোধ করি সেই গুরুমায়ের প্রভাব অ্যানের লেখক জীবনে বেশি। তাই তাঁর ভাষার বিশ্বে আখ্যানভিত্তিক গীতল বাণীর সাম্রাজ্য বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর হয়েছে। তাঁর একেকটি সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠেছে সবরকম লেখনশৈলীর অনুপম বাগান। কথাসাহিত্য হয়তো অ্যান কারসনে এসে আরেকবার বাঁক বদল করবে। জল গোটা বিশ্ব ভ্রমণ করছে। তাই সব কোণের খবর জলের জানা। মানুষ তথ্য ও আন্তঃসম্পর্কের মহাসন্ধির যুগে বাস করছে, তবু পৃথক ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাস্থ্যকর আড়াল থাকায় একই সময়ে সমস্ত সদস্যের জ্ঞান, গণ্ডি ও গন্তব্য জানতে পারে না। তাই আমার অভিমত এখানে ভবিষ্যৎ-আশ্রয়ী হলো। 

অভিনন্দন অটোবায়োগ্রাফি অব রেড, ইরোস দ্য বিটারসুইট, নক্স, দ্য বিউটি অব হাজবেন্ড, ম্যান ইন দ্য অফ আওয়ার্স, গ্লাস আয়রনি অ্যান্ড গডের স্রষ্টা অ্যান কারসন; কর্কট রাশির জাতিকা, যে রাশির কর্ম ও ভাগ্যনিয়ন্তা জল ও চাঁদ। 

সাহিত্যে নোবেলের সংবাদ পেতে পৃথিবী মুখিয়ে ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বিশ্বগণমাধ্যমে জানানোর আগে কবিকে জানাতে যখন ফোন করা হলো, অ্যান তখন মেরুজ্যোতির স্বর্গভূমিতে। বললেন, বাতাসের কবিতা শুনছি। বিস্মিত হয়েছিলেন। আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি, তবু বিস্মিতের আত্মিক বিনয় তাঁর ছিল। নোবেল পুরস্কার পর্ষদ জানিয়েছে, কেন অ্যান তাদের কাছে বিশেষ হলো। আদি গীতল ধ্রুপদি ধারার সঙ্গে আধুনিক ও প্রাণবন্ত কথাশৈলীর মিলন ঘটিয়েছেন অ্যান। এতে জন্ম নিয়েছে নতুন সাহিত্যশৈলী।

সুইডিশ একাডেমি জানিয়েছে, শব্দের নতুন অর্থ তৈরির প্রতি একজন কবির আকাঙ্ক্ষার অপূর্ব মিশ্রণ আছে অ্যানের লেখায়। প্রয়াত ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর লেখা ‘নক্স’ শিরোনামের কবিতা একটি অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই  পুরস্কারজয়ী কবি অ্যান কারসন পাবেন ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যার মূল্য প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার।

আরও পড়ুন

×