ফের উত্তপ্ত মণিপুর, শান্তি ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার আশ্বাস মোদির
নয়াদিল্লিতে মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিংহের সঙ্গে বৈঠকে মোদি
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:২৮
ভারতের মণিপুরে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে রাজ্যে শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজ্য সরকারকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
শনিবার নয়াদিল্লিতে মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিংহের সঙ্গে বৈঠকে এ আশ্বাস দেন মোদি। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ৭ লোক কল্যাণ মার্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে শান্তি ফেরাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেন।
তবে রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহ নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিজেপির এই নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, এক দিনে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া একটি পুলিশ স্টেশনে অগ্নিসংযোগ ও একাধিক ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে কামজং জেলার চাসাদ কুকি গ্রামে ৪২ বছর বয়সী এক কুকি নারী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এরপর নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়, যা শনিবার সকাল পর্যন্ত চলে। এ সংঘর্ষে ২২ বছর বয়সী এক যুবকও নিহত হন।
নিংচৌ গ্রামে কুকি ন্যাশনাল আর্মি-বার্মা এবং ভিলেজ ভলান্টিয়ার অব ইস্টার্ন জোনের সমন্বিত হামলায় দুই নাগা নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নাগা সিভিল ডিফেন্সের দুই স্বেচ্ছাসেবক গুলিবিদ্ধ হন। শনিবার সকালে একই গ্রামে সন্দেহভাজন জঙ্গি হামলায় দুই নাগা ব্যক্তির নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া উখরুল জেলায় সন্দেহভাজন জঙ্গি হামলায় ৪০ বছর বয়সী এক নেপালি ব্যক্তি নিহত হন।
সর্বশেষ সহিংসতাকে গত এক বছরের মধ্যে মণিপুরের অন্যতম প্রাণঘাতী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় রাজ্য কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন মণিপুর এবং মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কামজং জেলা প্রশাসন পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত, অস্ত্র বহন এবং নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
এদিকে কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি কাংপোকপি জেলায় ২৪ ঘণ্টার বন্ধের ডাক দিয়েছে। কুকি নারীর হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে কুকি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন এবং দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের (এনসিআর) কুকি-জো উইমেন্স ফোরাম। তারা ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিহত নারীর পাঁচ সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
বীরেন সিংহ পরিস্থিতিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত আরও শক্তভাবে সিল করার দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিংহ দিল্লিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করেন। ওই বৈঠকে রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। পুনর্বাসন, যাত্রীবাহী বাস চালু এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মতো বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে কীভাবে রাজ্যে শান্তি ফেরানোর চেষ্টা চলছে, তা শাহকে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মণিপুর সফরের আমন্ত্রণও জানান। শাহ অক্টোবরে মণিপুরে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তবে মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি সফর থেকে ফেরার পর রাজ্যে অশান্তি বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে শান্তি ও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরেন। ইম্ফল-দিমাপুর-গুয়াহাটি বাস পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়া এবং ইম্ফল-শিলচর ও ইম্ফল-দিমাপুর সড়ক দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাকের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থার ঘাটতি দূর করতে রাজ্য সরকারের চলমান উদ্যোগ সম্পর্কেও মোদিকে অবহিত করেন খেমচাঁদ সিংহ।
এ ছাড়া কয়েকটি রাজ্য সড়ককে জাতীয় সড়কে উন্নীত করার প্রস্তাব অনুমোদনের অনুরোধ জানান মুখ্যমন্ত্রী। ইম্ফলের রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসকে (রিমস) অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের (এআইআইএমএস) মর্যাদা দেওয়ার দাবিও তোলেন তিনি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকে মণিপুর সফরের আমন্ত্রণ জানান।
মোদি মণিপুরে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, রাজ্যের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। মণিপুরের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যা সমাধানে কেন্দ্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
- বিষয় :
- ভারত
- মণিপুর
- সহিংসতা
- নরেন্দ্র মোদি