ডেটা সেন্টারের কারণে বাসার পানিও পাচ্ছেন না যে দ্বীপের বাসিন্দারা
পানির সংকটে ক্ষুব্ধ বাতামের বাসিন্দাদের বিক্ষোভ। ছবি: বিবিসি
বিবিসি
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩৬
ইন্দোনেশিয়ার বাতাম দ্বীপে পানির সংকট নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, দ্বীপটিতে একের পর এক ডেটা সেন্টার গড়ে ওঠায় পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এতে বাসাবাড়িতে পানির সরবরাহ ব্যাহত হলেও ডেটা সেন্টারগুলোতে পানি ব্যবহারে ঘাটতি নেই।
সম্প্রতি প্রায় ৩০০ বাসিন্দা খালি প্লাস্টিকের বোতল ও পানির পাত্র হাতে নিয়ে দ্বীপের নংসা ডিজিটাল পার্কের একটি ডেটা সেন্টার প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন। তাদের বাড়িতে কল দিয়ে পানি আসছে না, অথচ ডেটা সেন্টারের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতে পর্যাপ্ত পানি ব্যবহার করা হচ্ছে-এমন অভিযোগ তুলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিক্ষোভকারী দেওয়ি সুসান্তি বিবিসিকে বলেন, ‘গত তিন মাস ধরে আমাদের কল দিয়ে এক ফোঁটা পানিও আসেনি। ডেটা সেন্টার আসার আগে আমাদের পানির সরবরাহ নির্ভরযোগ্য ছিল।’
বাতাম দ্বীপের পানি সরবরাহকারী সংস্থা বিবিসিকে জানিয়েছে, পানির সরবরাহ উন্নত করতে তারা কাজ করছে। তবে ডেটা সেন্টারগুলোর চাহিদার কারণে পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি সংস্থাটি।
_1791869711.jpg)
অন্যদিকে, দ্বীপটির বাণিজ্য ও শিল্প খাত তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থা বিপি বাতাম দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টিকে পানির সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাসিন্দাদের জন্য বরাদ্দ পানি ডেটা সেন্টারগুলোতে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছে তারা।
বাতাম দ্বীপে এ ধরনের বিক্ষোভ এবারই প্রথম নয়। দ্বীপটির জলাধারগুলোর পানির স্তর কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। একই সময়ে দ্বীপটিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভের পর কর্তৃপক্ষ বাতামে নতুন ডেটা সেন্টার স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানিয়েছে, মিঠাপানির জন্য জলাধারের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের পানি লবণমুক্ত করার প্ল্যান্ট তৈরি করতে হবে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এখন তাদের পানির জন্য ডেটা সেন্টারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ডেটা সেন্টার নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ ও প্রতিবাদ বাড়ছে।
বড় আকারের এসব ভবনের কারণে আবাসিক এলাকায় শব্দদূষণ, সারা রাত জ্বলে থাকা নিরাপত্তাবাতি এবং পানি ও বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
ডেটা সেন্টারে সার্ভার সচল রাখতে বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি অতিরিক্ত গরম হওয়া ঠেকাতে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ধরনের শীতলীকরণ ব্যবস্থা, যার কিছুতে প্রচুর পানি লাগে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সাধারণ ডেটা সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ মার্কিন গ্যালন পানি ব্যবহৃত হয়। পরিমাণটি দেশটির প্রায় এক হাজার পরিবারের দৈনিক পানির ব্যবহারের সমান। মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বড় ডেটা সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ২০০ পরিবারের সমপরিমাণ পানি ব্যবহার হতে পারে। একই সঙ্গে এমন একটি কেন্দ্রে ২২ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে।
প্রাকৃতিক মিঠাপানির উৎস না থাকায় দ্বীপটির প্রায় ১৩ লাখ মানুষ বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য নির্মিত ছয়টি কৃত্রিম জলাধারের ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছর দ্বীপটিতে পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর পেছনে ঐতিহাসিক মাত্রার ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতির প্রভাব থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন আকার ভূমি ইন্দোনেশিয়ার সিমুলেশন অনুযায়ী, বৃষ্টি না হলে নংসা জলাধার আগামী এক মাসের মধ্যে শুকিয়ে যেতে পারে। এই জলাধার থেকেই দেওয়ি সুসান্তির গ্রাম বাকাউ সেরিপে পানি সরবরাহ করা হয়।

দেওয়ি বলেন, পানির সংকটে তাদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চাল কেনার জন্য রাখা টাকা এখন পানির ড্রাম কিনতে খরচ করতে হচ্ছে। তার স্বামীকে পানি সংগ্রহের জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করতে হয়। এরপর সকালে তাকে কাজে যেতে হয়।
পানির সংকট অব্যাহত থাকলে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টিপাত ঘটানোর মতো ব্যবস্থা বিবেচনা করা হবে বলে এর আগে জানিয়েছিল দ্বীপটির পানি সরবরাহকারী সংস্থা।
বাতাম কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ১০টি ডেটা সেন্টার প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি নংসা ডিজিটাল পার্কে স্থাপিত হবে। দুটি ডেটা সেন্টার চালু রয়েছে এবং তৃতীয়টির নির্মাণকাজ চলছে। আরও অন্তত ছয়টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য বিবেচনাধীন রয়েছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছে বিপি বাতাম।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দ্বীপটিতে ডেটা সেন্টার খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে কাছের দেশ সিঙ্গাপুরের চাহিদার। ফেরিতে সিঙ্গাপুর থেকে বাতামে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে।
জমি ও জ্বালানিসংকটের কথা উল্লেখ করে ২০১৯ সালে সিঙ্গাপুর ডেটা সেন্টার নির্মাণ স্থগিত করেছিল। ২০২২ সালে দক্ষতাসংক্রান্ত নতুন মানদণ্ড চালুর পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরপর বিনিয়োগকারীরা বিকল্প গন্তব্য খুঁজতে শুরু করেন।
সিঙ্গাপুর দীর্ঘদিন ধরে রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জ-যার অংশ বাতাম এবং মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যকে নিজেদের পরিপূরক অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরছে। বিনিয়োগের সেই প্রবাহে জোহরেও বিপুল পরিমাণ ডেটা সেন্টার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। তবে শব্দ, ধুলাবালি ও পানির সংকট নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অসন্তোষের মুখে রাজ্যটিকে এসব কেন্দ্রে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি অবস্থান, তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলদেশীয় কেব্ল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাতাম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
দ্বীপটির নংসা এলাকায় হংকংভিত্তিক বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গাও ক্যাপিটাল এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান সিনার প্রিমেরা ১৩ হাজার বর্গমিটার আয়তনের একটি ডেটা সেন্টার গড়ে তুলছে। এপ্রিলে সিঙ্গাপুরের ডেওয়ান একটি ইন্দোনেশীয় রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থার সঙ্গে দেশটির অন্যতম বৃহৎ ডেটা সেন্টার নির্মাণের চুক্তি করে। কেন্দ্রটির সক্ষমতা হবে প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াট, যা গড়ে তিন লাখ ৫০ হাজার পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদার সমান। জুনে ডেওয়ান, চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া ও অস্ট্রেলীয় এআই স্টার্টআপ ফার্মাস ৩৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি ‘এআই ফ্যাক্টরি’র ঘোষণা দেয়।
সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাতাম দ্বীপে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে প্রায় ১০ লাখ বাড়িতে সরবরাহ করা সম্ভব।
এদিকে, দ্রুত ডেটা সেন্টার নির্মাণের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ বাড়ছে। তারা কর্তৃপক্ষকে প্রকল্প অনুমোদনের আগে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
- বিষয় :
- ডেটা সেন্টার
- পানির সংকট
- ইন্দোনেশিয়া