ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সংবাদ বিশ্লেষণ

নরেন্দ্র মোদির এক দাবি বনাম তিনদিনের ঘটনায় যত বৈপরীত্য

নরেন্দ্র মোদির এক দাবি বনাম তিনদিনের ঘটনায় যত বৈপরীত্য
×
×

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কার্টুন সংবলিত পোস্টার হাতে এক বিক্ষোভকারী। সোমবার কলকাতায়। ছবি: এএফপি

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:২৮ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:০৫

ক্ষমতায় থাকার ১২ বছরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অন্তত ৩০টি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক সম্মাননা পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের কূটনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি তিনি ভারতকে প্রায়ই ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্রের জননী হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু দিল্লির রাজপথে গত কয়েকদিনে বিপরীত চিত্র দেখা গেল। এই পরিস্থিতি যেমন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তেমনি সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাবের আলোচনাকেও সামনে আনছে।

বিতর্কের সূত্রপাত নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া- এসআইআর ঘিরে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়া হয়েছে। যা ক্ষমতাসীন বিজেপিকে আগামী নির্বাচনগুলোতে অন্যায্য সুবিধা দিতে পারে।

বিপরীতে কমিশন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, এসআইআরের মূল উদ্দেশ্য হলো মৃত, স্থানান্তরিত বা অযোগ্য নামগুলো যাচাই করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা। কিন্তু তরুণদের প্ল্যাটফর্ম সিজেপি এই যুক্তি না মেনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) পদত্যাগ দাবিতে ১০ অক্টোবর দিল্লিতে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। ১২ অক্টোবর (সোমবার) পদযাত্রা করেছে কংগ্রেসসহ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দলগুলো।

১০ অক্টোবরের পুলিশি ধরপাকড় ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো ভারতের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের পরিচয়কে প্রশ্ন ও বিতর্কের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর মধ্যেই মঙ্গলবার ভারতকে আবারও ‘গণতন্ত্রের জননী’ দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। 

নরেন্দ্র মোদি কী বলছেন?
দিল্লিতে ‘ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে’ ভাষণ দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। হিন্দুস্থান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোদি বলেন, ‘ভারত গণতন্ত্রের জননী। দেশটিতে ১০০টির বেশি ভাষা, প্রায় ৮০ হাজার নিবন্ধিত সংবাদপত্র, সাময়িকী এবং ১ হাজারের বেশি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল আছে।’

নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে ভারতে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০ কোটির বেশি। এখানে বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা বিতর্ক হয়।’

মোদির এই বক্তব্যের দাবির সঙ্গে গত কয়েকদিনের ঘটনাগুলোর বেশ বৈপরীত্য আছে। যেখানে রাজপথ, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান বিচারপতির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে।  

এক আন্দোলনে যত বৈপরীত্য সামনে আসছে
১০ অক্টোবর দিল্লির বিক্ষোভ ও পুলিশি পদক্ষেপে সরকারের সমালোচনা নতুন মাত্রা পায়। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ওই দিন দিল্লিতে কয়েক হাজার আন্দোলনকারীকে আটক করে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা এবং পরিবহন সেবায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।

বিক্ষোভ চলাকালে সাংবাদিকদের আটক ও তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, স্ক্রল ও নিউজলন্ড্রির মতো গণমাধ্যমের বেশ কয়েকজন কর্মীকে আটক করা হয়। এসব সাংবাদিকের মধ্যে কয়েকজনের অভিযোগ, আটকের পর তাদের ফোন কেড়ে নেওয়া ও দুর্ব্যবহার করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ৯ অক্টোবর এক বিবৃতিতে বিক্ষোভের আগেই দিল্লিতে কড়া বিধিনিষেধ ও ইন্টারনেট বন্ধের মতো বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটি ওই পরিস্থিতিকে ‘লকডাউন-সদৃশ বিধিনিষেধ’ হিসেবে আখ্যা দেয়। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান জানায়।

আন্দোলন ও সংবাদ সংগ্রহের বিষয়গুলো গণতান্ত্রিক অধিকার। এগুলোর ওপর নরেন্দ্র মোদি প্রশাসনের কড়াকড়ি আরোপের বিষয়টি পশ্চিমা গণমাধ্যমেও খবরের শিরোনাম হয়েছে। যা বৈশ্বিক দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য যথেষ্ট।

রাজপথের পাশাপাশি বিধানসভা ও সুপ্রিম কোর্টের মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানেও টানাপোড়েন দেখা গেছে। সোমবার কেরালার বিধানসভায় সিইসিকে অপসারণের দাবিতে একটি প্রস্তাব পাস হয়। মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের বিপরীতে বিরোধীতা করেন বিজেপির তিন বিধায়ক।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই প্রস্তাবে ‘অনিয়মের অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি’ ও ইসি সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো সিইসিকে অপসারণের দাবিতে বিধানসভায় এমন প্রস্তাব পাসের ঘটনা ভারতে এটিই প্রথম।

বিধানসভার প্রস্তাবের মাধ্যমে সিইসিকে অপসারণ করা যায় না। কিন্তু এটি মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আস্থাহীনতার একটি বার্তা তুলে ধরে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে ভি ডি সতীশন এক্সে লিখেছেন, ‘ভোটাধিকার অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। সংবিধান সমুন্নত রাখতে হবে। গণতন্ত্রকে জয়ী হতে হবে।’

অন্যদিকে, সর্বোচ্চ আদালতেও আইনি লড়াই একটি জটিল মোড় নিয়েছে। সোমবার বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ব্লক সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করেছে। এতে এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। একই বিষয়ে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দিতে চেয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। কিন্তু প্রধান বিচারপতি তা নাকচ করে দেন।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি ‘বিচারাধীন বিষয়’ ও সেগুলো নিয়ে আলোচনা করাকে ‘ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আইনি সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্ম সুপ্রিম কোর্ট অবজারভারের সহযোগী সম্পাদক ভি ভেঙ্কটেশন বলছেন, বিচারাধীন বিষয়ে এক পক্ষের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা যদি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হয়, তবে অপরপক্ষের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

দ্য ওয়্যারে প্রকাশিত নিবন্ধে ভেঙ্কটেশন একটি বিপরীত ঘটনারও বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের আদালতে বিচারাধীন বিভিন্ন মামলার একটি পক্ষ ছিল কেন্দ্রীয় সরকার। একই বছরের সেপ্টেম্বরে চন্দ্রচূড়ের বাসায় গণেশ পূজায় অংশ নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আইনজীবীরা এ নিয়ে আপত্তি জানালে প্রধানমন্ত্রী ও বিচারপতি দুজনই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। বিচারপতি চন্দ্রচূড় তখন বলেছিলেন, ওই সফরে কোনো ভুল ছিল না।

রাজপথ, বিধানসভা ও সর্বোচ্চ আদালতে এমন টানাপোড়েনের মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদির ঝুলিতে থাকা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলো ভারতের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানের প্রমাণ দেয়। কিন্তু ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক এক নথিতেও গণতন্ত্রকে ভারতের সঙ্গে অংশীদারত্বের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সালের ১৮ জুলাই প্রকাশিত ওই নথিতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তি হলো অভিন্ন মূল্যবোধ। এর মধ্যে আছে গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সমুন্নত রাখা।’

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অধিকার নিয়ে চলমান বিতর্ক; ভারতের পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে এর বাস্তব কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন

×