মধ্যবর্তী নির্বাচনের কৌশল নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষ, দোষারোপ সহযোগীদের
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
রয়টার্স
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫৫
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ে রিপাবলিকান দলের নির্বাচনী কৌশল হোঁচট খাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দলটির জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও রাজনৈতিক কর্মীদের দায়ী করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয়, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং প্রার্থী বাছাই নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। তবে যেসব সমর্থক অন্যথায় ভোট দিতে যেতেন না, তাদের উৎসাহিত করতে তিনি বারবার সমর্থকদের এমনভাবে আচরণ করতে বলছেন, যেন তিনিই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ লক্ষ্যে তিনি দেশজুড়ে ব্যস্ত প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে নিজের ভূমিকা এবং তার অজনপ্রিয়তা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন।
মতবিরোধের কেন্দ্রে রয়েছেন ট্রাম্পের সুপার প্যাক ‘ম্যাগা ইনকরপোরেটেড’-এর পরিচালক ও দীর্ঘদিনের সহযোগী জেমস ব্লেয়ার এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস। এত দিন মূলত সমালোচনার বাইরে থাকা ওয়াইলসের তদারকি নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচনী তহবিল ব্যবস্থাপনায় ব্লেয়ারের সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ওয়াইলসের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা ও মিত্র।
নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও জনমত জরিপে রিপাবলিকানদের অবস্থানের উন্নতি না হওয়ায় ট্রাম্প প্রশ্ন তুলছেন। একই সঙ্গে তার উপদেষ্টারাও একে অপরকে দায়ী করছেন। সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওয়াইলস ব্লেয়ারকে দায়ী করেছেন, আর ব্লেয়ার সমালোচনা করেছেন হোয়াইট হাউসের আইনবিষয়ক দলের। ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আসলে যা ঘটছে, তা হলো নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি।’
জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা জয় পেতে পারে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই এখনো অনিশ্চিত। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে তার আইন প্রণয়নের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে সমন জারির ক্ষমতা পাবে।
শুক্রবার ওয়াইলসের পক্ষ নিয়ে ট্রাম্প তাঁকে ‘বুদ্ধিমতী’ ও ‘কঠোর’ বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, ওয়াইলস তার পদে বহাল থাকবেন। ট্রাম্প বলেন, ‘সুসি এখানে আছেন এবং তিনি আরও অনেক দিন থাকবেন।’
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গেল সূত্রগুলোর বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তারা ‘ঘরে বসে থাকা বিশেষজ্ঞ, যারা ভিত্তিহীন জল্পনা-কল্পনা ছড়াচ্ছেন’। মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও ওয়াইলস সাড়া দেননি।
রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের। ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয় তিনি মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন, রিপাবলিকানরা জিতলে এর ‘পুরো কৃতিত্ব’ তাঁর প্রাপ্য হবে। তবে দলটি হেরে গেলে তাঁকে ‘কোনোভাবেই দোষারোপ করা উচিত নয়’। সম্প্রতি তিনি সমাবেশগুলোতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ফল খারাপ হওয়ার প্রবণতা থাকে।
অথচ নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং নিজের ব্যক্তিগত আনুগত্য বা ক্ষোভের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাইয়ের মতো যেসব কৌশল নিয়ে এখন তিনি প্রশ্ন তুলছেন, সেগুলো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ট্রাম্প নিজেও ভূমিকা রেখেছিলেন। বর্তমানে তাঁর অনুমোদনের হার প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুরো মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষকে এর কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক সহযোগীদের নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে অক্টোবরের শুরুতে। সে সময় ব্লেয়ার ও ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার আরেক সাবেক যুগ্ম ব্যবস্থাপক ক্রিস লাসিভিটা বসনিয়ার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল রিপাবলিকা স্রপস্কায় যান। ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় নির্বাচনের আগে ওই অঞ্চলের সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার বিনিময়ে তাঁরা বড় অঙ্কের অর্থ নিয়েছিলেন।
এরপর ট্রাম্প তাদের দুজনের কাছ থেকেই নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। ৭ অক্টোবর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তাদের ‘বাইরের পরামর্শক’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত দেখা গেলে তাদের ‘অবিলম্বে বরখাস্ত’ করার হুঁশিয়ারি দেন।
হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্লেয়ার কেন বিদেশে লাভজনক কাজে যুক্ত হয়েছেন। এ বিষয়ে অবগত তিন ব্যক্তি এমন তথ্য জানিয়েছেন।
তাদের একজনের ভাষ্য, ট্রাম্পকে না জানিয়েই ওয়াইলস ওই সফরের অনুমোদন দিয়েছিলেন। এতে রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের ওপর তাঁর তদারকির পরিধি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, ব্লেয়ারের বাইরের কাজের কারণে তিনি রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছেন কি না, সেটিই ট্রাম্পের বড় উদ্বেগ।
এক বিবৃতিতে ব্লেয়ার বলেন, ‘এই কাদা ছোড়াছুড়ি হাস্যকর এবং তা কোনো সুফল বয়ে আনবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আমি নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জেতাতে মনোনিবেশ করছি। অন্য সব রিপাবলিকানেরও একই কাজ করা উচিত।’
অন্য এক বিবৃতিতে লাসিভিটা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর দল সব সময়ই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ওপর মনোযোগ দিয়েছেন। সারা বছর ধরে এবং বিভিন্ন প্রচারণায় প্রেসিডেন্ট যে অর্থ, বার্তা ও অনুপ্রেরণা নিয়ে কাজ করছেন, তা-ই এর প্রমাণ। যারা কখনো লড়াইয়ের ময়দানে নামেনি, এমন নামহীন কাপুরুষদের মন্তব্যের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’
৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ট্রাম্প দেশজুড়ে জনসভা করছেন। ১ অক্টোবর থেকে বিভিন্ন স্থানে প্রচারণামূলক সফর করেছেন তিনি। তবে এসব প্রচারণা রিপাবলিকানদের জনসমর্থন বাড়াতে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে দলের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ট্রাম্পের নির্বাচনী সুপার প্যাক ‘ম্যাগা ইনকরপোরেটেড’ এখন পর্যন্ত ২০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এত অর্থ খরচের পরও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইগুলোতে রিপাবলিকানদের জনসমর্থন কেন বাড়েনি, তা জানতে চেয়েছেন ট্রাম্প। নির্বাচনের আগে তিনি আরও অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প তার রাজনৈতিক সহযোগী ও উপদেষ্টাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া কেন রিপাবলিকানদের জন্য প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি। এ বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন।
টেক্সাস অঙ্গরাজ্য নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে রিপাবলিকানদের। সেখানে কংগ্রেসে আসন বাড়ানোর লক্ষ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ কৌশলের সাফল্য আংশিকভাবে হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে, যেমনটি ২০২৪ সালের নির্বাচনে দেখা গিয়েছিল। জনমত জরিপের ইঙ্গিত, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগের কারণে সেই সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
কিছু রিপাবলিকান আশঙ্কা করছেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ হিতে বিপরীত হতে পারে। এতে দলের সুবিধা হওয়ার পরিবর্তে বর্তমান জনপ্রতিনিধিরা আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়তে পারেন। সূত্রগুলোর একজন বলেন, ‘সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে ট্রাম্পের ভোটারদের ভিত্তি অনেক বেশি খণ্ডিত হয়ে পড়েছে।’
ট্রাম্প আগে বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ব্লেয়ার হোয়াইট হাউসে ফিরবেন। তার চলে যাওয়াকে তিনি ‘সাময়িক বিরতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তবে দুটি সূত্র জানিয়েছে, ব্লেয়ারের ফিরে আসার সম্ভাবনা এখন আর নেই। তাদের একজন বলেন, ‘তিনি আর ফিরে আসছেন না। এমনটা আর ঘটছে না।’
ওয়াইলসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অবশ্য এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ট্রাম্পের মিত্র ও সহযোগীদের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের কার্যক্রমে আরও শৃঙ্খলা আনতে ওয়াইলস ভূমিকা রেখেছেন।
হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ আরেক ব্যক্তি বলেন, ট্রাম্প কিছু বিষয়ে বিরক্ত হতে পারেন, তবে ওয়াইলস কার্যকরভাবে পুরো ব্যবস্থাকে সচল রেখেছেন।
- বিষয় :
- ডোনাল্ড ট্রাম্প
- যুক্তরাষ্ট্র
- নির্বাচন