ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

জীবাশ্ম

১৬ কোটি বছর আগের সমুদ্র দানবের খাদ্যাবশেষ

১৬ কোটি বছর আগের সমুদ্র দানবের খাদ্যাবশেষ
×
×

ডাইনোসররা যখন স্থলভাগে রাজত্ব করত, বিশালাকার প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী প্লেসিওসর তখন দাপিয়ে বেড়াত সমুদ্রে। প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে ক্রিটেসিয়াস যুগে ডাইনোসরদের সঙ্গেই প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ছবি: নেচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২৬ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২৬

প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে বর্তমান নরওয়ের উপকূলের অগভীর সমুদ্রে বিচরণ করত লম্বা গলার এক ধরনের সামুদ্রিক সরীসৃপ। শিকার ধরার পর খাবারের যেসব অংশ হজম করতে পারত না, সেগুলো উগরে দিত প্রাণীটি। ভাঙা ঝিনুকের খোলস, সামুদ্রিক কেঁচো ও লতাপাতার টুকরোয় ভরা সেই অপাচ্য খাদ্যাবশেষ সময়ের সঙ্গে পাথরে পরিণত হয়। সম্প্রতি তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য খনন করা পাথরের নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন সেই প্রাচীন নিদর্শন।

ভূতাত্ত্বিক সাময়িকী জিওলজিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব স্তূপ সম্ভবত প্লেসিওসর গোত্রের সামুদ্রিক সরীসৃপের উগরে দেওয়া অপাচ্য খাবার। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের জীবাশ্মকে ‘রেগার্জিটালাইটস’ নামে চিহ্নিত করেন। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন নরওয়ের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইকুইনরের ভূতাত্ত্বিক ডির্ক নাউস্ট। সাধারণত পাহাড়, পাথরের খনি কিংবা নদীর তীরে জীবাশ্মের সন্ধান মেলে। তবে এই আবিষ্কার এসেছে নরওয়ের ট্রোল তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের গভীর কূপ থেকে তোলা পাথরের নমুনায়। ১৫ থেকে ১৬ কোটি বছর আগের ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকে নমুনাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল। সে সময় এলাকাটি ছিল নদীবিধৌত ব-দ্বীপ। 

ভূতাত্ত্বিক নাউস্ট ২০ থেকে ৩০টি এমন স্তূপ পরীক্ষা করেন। উচ্চ রেজল্যুশনের স্ক্যান, কূপের ছবি ও ছবি বিশ্লেষণ করে তিনি দেখেন, বিভিন্ন আকারের অক্ষত ও ভাঙা খোলস, কেঁচো এবং উদ্ভিদের টুকরো একসঙ্গে আটকে রয়েছে। এগুলো স্রোত বা ঢেউয়ের মাধ্যমে জমে ওঠা পলির মতো নয়।

স্তূপগুলো পাওয়া গেছে নদীর ব-দ্বীপের সামনের অংশে, যেখানে মিঠাপানি ও সমুদ্রের লবণাক্ত পানি মিলিত হতো। অথচ এসব স্তূপে থাকা কিছু সামুদ্রিক প্রাণী কেবল স্থিতিশীল লবণাক্ত পানিতেই থাকার কথা। গবেষকদের ধারণা, অন্য কোনো প্রাণী সেগুলো খেয়ে ওই এলাকায় এসে অপাচ্য অংশ উগরে দিয়েছিল।

স্তূপগুলো জীবাশ্মীভূত মল, ঝড়ের কারণে জমে থাকা খোলস কিংবা গর্তে আটকে থাকা উপাদানও হতে পারত। তবে খোলসের অনিয়মিত মিশ্রণ, জমাট বাঁধা গঠন এবং আংশিক পরিপাকের চিহ্ন দেখে গবেষকরা একে প্রাণীটির উগরে দেওয়া বমি হিসেবেই বিবেচনা করেছেন।

সম্ভাব্য প্রাণীদের মধ্যে ছিল হাঙরের একটি প্রাচীন গোত্র, মাছ ও সামুদ্রিক সরীসৃপ। শেষ পর্যন্ত গবেষকরা সিদ্ধান্ত দেন ধারণা ক্রিপ্টোক্লিডিডি পরিবারের প্লেসিওসরদের ওপর। লম্বা গলা, ছোট মাথা ও সরু দাঁতবিশিষ্ট এসব প্রাণী সমুদ্রের তলদেশের কাদা থেকে ঝিনুক, কৃমি, ক্রাস্টেশিয়ান ও সামুদ্রিক লিলি খেত। জীবাশ্মে পাওয়া খাদ্যাবশেষের সঙ্গে তাদের খাদ্যাভ্যাসের মিল রয়েছে।

আবিষ্কৃত সব স্তূপ অবশ্য অক্ষত ছিল না। সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী প্রাণী, পানির স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে অনেক স্তূপ আশপাশের পলির সঙ্গে মিশে গেছে। কিছু স্তূপ দ্রুত পলির নিচে চাপা পড়ায় এবং খনিজ জমে শক্ত হয়ে যাওয়ায় টিকে ছিল।

গবেষকরা এসব নিদর্শনকে ‘ভোমিটাস’ নামে একটি স্বতন্ত্র ট্রেস জীবাশ্মের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বদলে তার আচরণের প্রমাণ বহন করে ট্রেস জীবাশ্ম।

গবেষণাটির গুরুত্ব শুধু প্রাচীন খাদ্যাবশেষ আবিষ্কারে সীমাবদ্ধ নয়। এসব নিদর্শন থেকে ধারণা পাওয়া যায়, জুরাসিক যুগের সামুদ্রিক সরীসৃপ কী খেত এবং কোথায় গিয়ে অপাচ্য অংশ ত্যাগ করত। তেল অনুসন্ধানের জন্য তোলা পাথরের নমুনা তাই প্রায় ১৬ কোটি বছর আগের সামুদ্রিক জীবনের এক বিরল চিত্র সামনে এনেছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

আরও পড়ুন

×