বিশ্লেষণ
ইসরায়েলে ফিলিস্তিনপন্থিদের উত্থান বদলে দিচ্ছে সমীকরণ
নির্বাচনী প্রচারের কার্যালয়ে উচ্ছ্বসিত ফিলিস্তিনপন্থি জয়েন্ট লিস্টের নেতারা। মঙ্গলবার ইসরায়েলের নাজারেতে। ছবি: এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:৩৬ | আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:৫৫
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচনে ফিলিস্তিনপন্থি দলগুলোর আসন বৃদ্ধির আভাস পাওয়া গেছে। এতে সরকার গঠন নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহুবিরোধী জোটকে সরকার গঠন করতে হলে আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে। তা না হলে নেতানিয়াহুর আবার ক্ষমতায় ফেরার পথ সহজ হবে।
ইসরায়েলে বসবাসরত আরব ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূতদের একাধিক রাজনৈতিক দল আছে। এর একটি রাআম, যার নেতৃত্বে আছেন মনসুর আব্বাস। অন্যদিকে, হাদাশ, তাআল ও বালাদ- এই তিনটি দল মিলে গঠন করেছে জয়েন্ট লিস্ট। জোটটির নেতৃত্বে আছেন ইউসুফ জাবারিন।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম চ্যানেল ১১, ১২ ও ১৩-এর বুথফেরত জরিপে জয়েন্ট লিস্ট ১১ থেকে ১২টি এবং রাআম সাতটি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে ‘আরব ব্লক’-এর মোট আসন দাঁড়াতে পারে ১৮ থেকে ১৯টিতে।

সরকার গঠন করতে নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬১টি প্রয়োজন। বাংলাদেশ সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় হারেৎজ জানায়, প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট গণনা শেষে নেতানিয়াহুর জোট ৫৪টি এবং বিরোধী ‘চেঞ্জ ব্লক’ ৪৯টি আসন পাওয়ার পথে। বাকি ভোট গণনার পর এই হিসাব বদলাতে পারে।
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, নেতানিয়াহুর জোটে আছে পাঁচটি দল- লিকুদ পার্টি, ওতজমা ইয়েহুদিত, রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাস। জোটটি ডানপন্থি রাজনীতির অনুসারী।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী চেঞ্জ ব্লকে আছে ইয়াশার, ইয়াচাদ বা টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটস। দলগুলোর রাজনৈতিক আদর্শে পার্থক্য থাকলেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্য তাদের এক করেছে।
ফিলিস্তিনপন্থি দলগুলো কারা?
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোকে প্রায়ই ‘আরব ব্লক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব দলকে শুধু মুসলিমদের দল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এগুলোর সঙ্গে মূলত ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সম্পর্ক আছে। তাদের বড় অংশ ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েলের সীমানার মধ্যে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনি আরবদের বংশধর।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব। তবে দেশটির ৭৩ লাখ ভোটারের মধ্যে তাদের অংশ প্রায় ১৮ শতাংশ।

ইসরায়েল পলিসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, জয়েন্ট লিস্টের শরিক হাদাশ একটি আরব-ইহুদি বামপন্থি দল। তাআল ধর্মনিরপেক্ষ আরবদের অধিকার, নাগরিকদের সমতা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। বালাদ ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়। দলটি ইসরায়েলকে শুধু ইহুদিদের রাষ্ট্র হিসেবে না রেখে সব নাগরিকের রাষ্ট্রে রূপান্তরের পক্ষে।
একসময় ইসলামপন্থি দল হিসেবে পরিচিত রাআম এখন ইসরায়েলের আরব সম্প্রদায়ের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। দলটি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। একই সঙ্গে আরব নাগরিকদের স্বার্থে ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতায়ও আগ্রহী। ২০২১ সালে দলটি বেনেট-লাপিদ জোটের অংশ হয়ে সরকার গঠনে ভূমিকা রেখেছিল।
বিরোধীদের সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলবে?
নেসেটের ১২০ আসনের জন্য এবার ১১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ইসরায়েলে ভোটাররা মূলত দলকে ভোট দেন। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে আসন বণ্টন হয়। কোনো দল জাতীয় ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেলে পার্লামেন্টে আসন পাওয়ার যোগ্য হয়।
টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, আরব দলগুলোর আগের সর্বোচ্চ সাফল্য ছিল ২০২০ সালে। সে সময় রাআমসহ জয়েন্ট লিস্ট ১৫টি আসন পেয়েছিল। সবশেষ পার্লামেন্টে তাদের সম্মিলিত আসন ছিল ১০টি। ফলে এবার তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ার সম্ভাবনা নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নেসেটে আরব দলগুলোর আসন বাড়লে সরকার গঠন ও নীতিনির্ধারণের আলোচনায় তাদের গুরুত্ব বাড়তে পারে। তবে আসনসংখ্যা বাড়লেই নীতিগত পরিবর্তন নিশ্চিত হয় না। সরকার গঠনের আলোচনায় জয়েন্ট লিস্ট ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনের মতো দাবি জানিয়েছে। এসব দাবিতে সমঝোতা করতে হলে চেঞ্জ ব্লকের নেতাদেরও নিজেদের অবস্থান বিবেচনা করতে হবে।

এখানেই দেখা দিতে পারে মতপার্থক্য। দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, গাদি আইজেনকোট সমঝোতার ক্ষেত্রে চারটি শর্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে আছে- ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ মেনে নেওয়া, ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলিদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় অংশগ্রহণ এবং হামাসের নিন্দা জানানো।
জয়েন্ট লিস্টের নেতারা অবশ্য মনে করেন, তাদের ওপর শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ আইজেনকোটের নেই। মঙ্গলবার ভোট গণনার সময় হাদাশের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ শিবিতা বলেন, ‘জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে শর্ত চাপিয়ে দিয়ে কাজ হবে না। আমরা সমান অবস্থান থেকে আলোচনা করব, কারণ আমাদের একে অপরকে প্রয়োজন।’
নির্বাচনের আগে চেঞ্জ ব্লকের নেতারা আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। তবে বুধবার এই জোটের বামপন্থি দল ডেমোক্র্যাটসের নেতা ইয়ার গোলান নিজের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দেন। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার পক্ষে মত দেন।
গোলান আরও বলেন, নেতানিয়াহু ইহুদি ও আরবদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেন। তাঁর মতে, আরব ইসরায়েলি নাগরিকদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিবর্তন আনার সুযোগ আছে।
নেতানিয়াহু কি আরবদের সঙ্গে সমঝোতা করবেন?
বুথফেরত জরিপে কোনো পক্ষেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আভাস নেই। চূড়ান্ত ফলেও যদি কোনো জোট ৬১টি আসন না পায়, তাহলে সরকার গঠনে অন্য দলের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে নেতানিয়াহু কি আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় যাবেন?
নির্বাচনের আগে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেছিলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজন হলে নেতানিয়াহু রাআমের সঙ্গে কাজ করতে পারেন।

তবে ভোটের পর নেতানিয়াহু আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি আরবদের সমর্থন নিয়ে কোনো নেতার দেশ শাসন করা উচিত নয়। আমাদের অবশ্যই ডানপন্থিদের একটি শক্তিশালী সরকার গঠন করতে হবে।’ লিকুদ পার্টির এই নেতা আরও বলেন, ইহুদি ও জায়নবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠন গ্রহণযোগ্য নয়।
নেতানিয়াহুর এই অবস্থানের বিপরীতে চেঞ্জ ব্লকের কিছু নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার পক্ষে কথা বলছেন। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে শুধু আসনসংখ্যাই নয়, রাজনৈতিক শর্ত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আরব দলগুলোর আসন বাড়লে সরকার গঠনের আলোচনায় তাদের প্রভাব বাড়তে পারে। এতে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, বৈষম্য এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব দাবির কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নির্ভর করবে জোটের শর্ত ও ক্ষমতাসীনদের নীতিগত অবস্থানের ওপর।
তাই এবারের ভোটে ইসরায়েলের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলালেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রগতি এখনো নিশ্চিত নয়।
- বিষয় :
- ফিলিস্তিনি
- রাজনৈতিক দল
- নির্বাচন
- ইসরায়েল
- ভোট
- সমঝোতা
- রাজনীতি