ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

ইসরায়েলে ভোট শেষে অচলাবস্থা, সরকার গঠনে সামনে ৪ পথ

ইসরায়েলে ভোট শেষে অচলাবস্থা, সরকার গঠনে সামনে ৪ পথ
×
×

ইসরায়েলে ভোট গণনা শেষেও কোনো জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ইলাস্ট্রেশন: মিডল ইস্ট আই

সিএনএন

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:১৩ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৩০

ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট গণনা শেষ হয়েছে। এতে কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৬১) পায়নি। এমন অবস্থা দেশটিকে আগামী কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাসের জন্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

প্রধান দুটি জোটের একটির নেতৃত্বে আছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি দল লিকুদ। অপরটিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা গাদি আইজেনকোটের মধ্যপন্থি দল ইয়াশার। ভোট গণনা শেষে উভয় জোটের প্রাপ্ত আসন যথাক্রমে ৫৩ ও ৪৮। আরব ব্লক পেয়েছে বাকি ১৯টি।

কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এখন তাহলে নতুন সরকার গঠন কীভাবে সম্ভব?

কাজটি মোটেও সহজ হবে না। রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজন এতটাই গভীর যে, সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন। তবে সরকার গঠন একেবারে অসম্ভব নয়। 

দলীয় নেতারা যদি নির্ধারিত ১২ সপ্তাহের মধ্যে কোনো সমাধানে পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে ইসরায়েলিদের আবারও ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। এ পরিস্থিতি এড়াতে সম্ভাব্য কয়েকটি পথ আছে।

দৃশ্যপট ১: বিরোধী জোটের সরকার
কাগজে-কলমে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার সবচেয়ে নিশ্চিত পথ হলো ইহুদি ও আরব দলগুলোর সহযোগিতায় বিরোধী সরকার গঠন। তবে এ পথের সবচেয়ে বড় বাধাটি আদর্শিক।

চেঞ্জ ব্লকের ডানপন্থি দুই দলের নেতা- নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান আরব দল রাআম ও জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে চান না। জোটের ভেতরে থেকে কিংবা বাইরে থেকেও সমর্থন নিতে অনীহা দেখিয়েছেন। 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে এ দুই নেতা আরব দলগুলোর ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান কঠোর করেছেন।

ভোট গণনা শেষে জোটগুলোর প্রাপ্ত আসন। ইলাস্ট্রেশন: এএফপি

ইসরায়েলের ইতিহাসে মাত্র একবারই কোনো আরব দল পূর্ণাঙ্গভাবে সরকারে অংশ নিয়েছিল। ২০২১ সালে রাআম আট দলীয় একটি জোট সরকারের অংশ হয়। ওই সরকার নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয়েছিল। তবে ক্ষমতায় থাকার মাত্র এক বছর পরই জোটটি ভেঙে যায়।

সরকার গঠন করতে না পারলেও বিরোধী দলগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তারা নেসেটের স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পরিবর্তন আনতে পারে। এর মাধ্যমে নেতানিয়াহুর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতাও সীমিত করা সম্ভব। তবে ইসরায়েলের নেতৃত্ব থেকে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে নতুন জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা এখনো অত্যন্ত জটিল ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর।

দৃশ্যপট ২: জাতীয় ঐক্যের সরকার
আরেকটি সম্ভাবনা হলো, দুটি রাজনৈতিক জোট ভেঙে গিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করা। এক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ অবশ্যই সরকারে থাকবে। বর্তমান জোটের কয়েকটি শরিক দলও এতে যুক্ত হবে। পাশাপাশি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিরোধী জোটের অন্তত একটি দলকেও সরকারে রাখতে হবে।

ধারণা করা হচ্ছে, বিরোধী দলকে সরকারে জায়গা দিতে নেতানিয়াহু তাঁর কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে রাজি হতে পারেন। তবে কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও ধর্মীয় দলগুলোকে বাদ দিতে তিনি রাজি নন।

আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের দাবিতে গাদি আইজেনকোটের বাসভবনের সামনে বামপন্থিদের বিক্ষোভ। বৃহস্পতিবার রাতে হার্টসলিয়া শহরে। ছবি: এএফপি

আইজেনকোট নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে বসার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। কারণ অবস্থান পরিবর্তন করলে সেটিকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখবেন অনেক ইসরায়েলি। বিশেষ করে যারা ‘বিবি’ নামে পরিচিত নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আগ্রহী।

দৃশ্যপট ৩: দলত্যাগী ৮ এমপি দরকার
বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্য বা স্বতন্ত্র আইনপ্রণেতাদের দলত্যাগে উৎসাহিত করে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। তবে বিরোধী জোটের চার দলের নেতা- আইজেনকোট, বেনেট, লিবারম্যান ও ইয়ার গোলান সবাই নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আট আসন পিছিয়ে আছে। ফলে সরকার গঠনের জন্য আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যকে দলত্যাগে রাজি করানো বেশ কঠিন হবে।

দৃশ্যপট ৪: আরেকটি নির্বাচন
সরকার গঠনের জন্য ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ পার্লামেন্টে আসন পাওয়া দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে পরামর্শ করবেন। তাঁদের মতামত নেওয়ার পর তিনি একজন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। আরব দলগুলো আইজেনকোটের প্রতি সমর্থন জানাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ইয়াশার দলের নেতা সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ পেতে পারেন।

প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হওয়ার পর ওই নেতা সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো হতে পারে। এ সময়ের মধ্যে সফল না হলে প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় একজন নেতাকে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে বলবেন। তাঁর জন্যও সময় থাকবে ২৮ দিন।

এরপর নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা প্রেসিডেন্টের কাছে তৃতীয় একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারবেন। ওই প্রার্থী জোট সরকার গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় পাবেন।

এভাবেও কোনো সমাধান না এলে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এই সময়সীমার হিসাব অনুযায়ী, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন নেতানিয়াহু। তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অপেক্ষা করার সুযোগ আছে তাঁর। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকোট প্রথম সুযোগ পেয়ে ব্যর্থ হলে সরকার গঠনের দায়িত্ব নেতানিয়াহুর হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। 

নেতানিয়াহু নিজেও ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইসরায়েলকে আবার নির্বাচনে যেতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাস নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে নতুন করে নির্বাচনের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তবে সেটি আগামী মার্চ কিংবা মে মাসের আগে নয়। সেটি হলে আট বছরের মধ্যে দেশটিতে সপ্তমবারের মতো পার্লামেন্ট নির্বাচন হবে।

আরও পড়ুন

×