ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ইউরোপজুড়ে তরুণদের বিক্ষোভ

ফ্রান্সে প্রতিবাদ আর সহিংসতা হাত ধরাধরি করে চলছে

ফ্রান্সে প্রতিবাদ আর সহিংসতা হাত ধরাধরি করে চলছে
×
×

পশ্চিম ফ্রান্সের বোর্দোতে বিক্ষোভের সময় কাঁদানে গ্যাসের মধ্যে একজন বিক্ষোভকারীকে ফরাসি পতাকা নাড়াতে দেখা যায়। ছবি: এএফপি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৪:৪৪ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৪:৪৪

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধনমান ব্যয়, আবাসন সংকট এবং জনসেবা খাতের বেহাল দশায় ইউরোপজুড়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। ফ্রান্স থেকে শুরু করে স্পেন, ইতালি ও জার্মানি– ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন।

সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণদের নেতৃত্বে এই বিক্ষোভ ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফ্রান্সে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের সঙ্গে সহিংসতা যেন এখন অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে। অথচ একসময় দেশটিতে আন্দোলনের চিত্র এমন ছিল না। নতুন প্রজন্মের কাছে বিক্ষোভ মানেই এখন কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, রাবার বুলেট ও স্টান গ্রেনেডের মুখোমুখি হওয়া। একসময় ফ্রান্সের রাজপথের আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিক্ষোভকে ঘিরে সংঘর্ষ ও সহিংসতার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া মানেই এখন সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামা।

ফ্রান্সে মূলত শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তবে ১৭ অক্টোবর সেই প্রতিবাদ সহিংস রূপ নেয়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সহিংসতায় পরিণত হয়।

সাধারণ মানুষ শান্তিপূর্ণ মিছিল করলেও কিছু উগ্র গোষ্ঠী সরকারি ভবন, বিলাসবহুল দোকানপাট এবং পুলিশের গাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে প্রায় ১২২ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে একটি গবেষণায় উঠে এসেছে।

পরবর্তী সময় এই আন্দোলনে শিক্ষক, অভিভাবক, ট্রেড ইউনিয়ন, অগ্নিনির্বাপণকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা যোগ দেন। প্রায় চার লাখ ১০ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় কমানো এবং সরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানান। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিভিত্তিক সংখ্যা নির্দিষ্ট করা এবং শিক্ষা খাতে ৫০০ কোটি ইউরো বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার।

তবে আন্দোলনকারীরা একে পর্যাপ্ত মনে করছেন না। ফ্রান্স সরকার আজ শনিবার ঘোষিত বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে। আগামী ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে দেশটির শ্রমিক ইউনিয়নগুলো।

ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে ক্ষোভের উত্তাপ
ফ্রান্সের সংকট এখন পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে। স্পেনের মাদ্রিদে বাড়ি ভাড়া অতিরিক্ত বাড়ায় ৮৭ বছরের এক বৃদ্ধাকে উচ্ছেদ করার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়, যা পরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। ইতালিতেও তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছেন। এ ছাড়া পর্তুগাল, আলবেনিয়া, গ্রিস ও বেলজিয়ামেও একযোগে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।

জার্মানির ৩২ শহরে আজ বিক্ষোভ কর্মসূচি
জার্মানিও আজ শনিবার বড় ধরনের আন্দোলনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। ‘জেন-জি রেগেল্ট’ নামে নতুন একটি তরুণ সংগঠনের আহ্বানে দেশটির প্রায় ৩২টি শহরে আজ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে। সংগঠনটি সরকারের কাছে বাজেট কাটছাঁটের নীতি বন্ধ করা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দাবি জানিয়ে খোলা চিঠি দিয়েছে। এতে ইতোমধ্যে বহু মানুষ স্বাক্ষর করেছেন এবং হাজার হাজার তরুণ রাজপথে নামার প্রস্তুতি নিয়েছেন।

অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক জটিলতা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে ইউরোপীয় সরকারগুলোর কাছে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার সুযোগ কমে এসেছে। ফ্রান্সের মতো দেশের জিডিপির প্রায় ১১৯ শতাংশই এখন ঋণ। এই অর্থনৈতিক সংকট রাজনীতিকেও তীব্রভাবে প্রভাবিত করছে।

কিছু ডানপন্থি নেতা এই সহিংসতার জন্য অভিবাসননীতিকে দায়ী করলেও বিরোধীরা বলছেন, নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতেই ডানপন্থিরা অভিবাসন ইস্যুকে সামনে আনছেন। সামনে বেশ কয়েকটি দেশে নির্বাচন থাকায় এই সংকট ইউরোপীয় রাজনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন

×