‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ গঠনের প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক, আর্মেনিয়ার পার্লামেন্টে মারমারি
আর্মেনিয়ার পার্লামেন্টে মারামারির দৃশ্য
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:২২ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:২৭
‘সব নারীকে সন্তুষ্ট করতে সেক্স মন্ত্রণালয়’ নামে একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আর্মেনিয়ার বিরোধী দলের এক নেতার চাচাতো ভাই। তার সেই পুরোনো বিতর্কিত মন্তব্য পার্লামেন্টে তুলে ধরতেই শুরু হয় তুমুল বাগ্বিতণ্ডা। একপর্যায়ে তা রূপ নেয় হাতাহাতিতে। সংসদ সদস্যদের মধ্যে চলে ঘুষি ও লাথি, এমনকি বিরোধীদের দিকে চেয়ার ছুড়ে মারেন পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকারও।
এ ঘটনায় সহিংসতার নিন্দা জানালেও নিজ দলের সংসদ সদস্যদের সমর্থন করেছেন আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান। তার দাবি, বিরোধী দলে থাকলেই কেউ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করার অধিকার পান না।
যে মন্তব্য ঘিরে উত্তেজনার শুরু
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আর্মেনিয়ার বিরোধী দল স্ট্রং আর্মেনিয়ার প্রধান নারেক কারাপেতিয়ানের চাচা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সামভেল কারাপেতিয়ানের ছেলে সারগিস কারাপেতিয়ান একটি পডকাস্টে অংশ নেন। সেখানে দেশের জনসংখ্যা সংকট নিয়ে আলোচনার সময় তিনি একটি ‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন।
সারগিস কারাপেতিয়ান বলেন, তার বাবার নেতৃত্বাধীন দল ক্ষমতায় এলে কোনো নারী অসন্তুষ্ট থাকবেন না। যৌনতা ছাড়া জনসংখ্যা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তার এই মন্তব্য আর্মেনিয়ার নারীদের প্রতি অবমাননাকর বলে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
সেই বিতর্কিত মন্তব্যই এবার পার্লামেন্টে তুলে আনেন ক্ষমতাসীন সিভিল কন্ট্রাক্ট পার্টির সংসদ সদস্য তারন চাখোয়ান। তিনি বিরোধী নেতা নারেক কারাপেতিয়ানের পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গও তোলেন।
চাখোয়ান বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এখন সরকারকে দুর্নীতি ও ভুয়া খবর নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, কারাপেতিয়ানের চাচা, বাবা ও কাজিনসহ তার পরিবারের সদস্যরা রাজনীতিতে জড়িত—এ জন্য তাকে দায়ী করা যায় না।
এরপর তিনি সারগিস কারাপেতিয়ানের সেই মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, নারীদের সন্তুষ্ট করতে একটি মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে এখনো ক্ষমা চাননি তারা।
কথা-কাটাকাটি থেকে মারমারি
চাখোয়ানের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে বিরোধী নেতা নারেক কারাপেতিয়ান নিজের আসন থেকে তাকে উদ্দেশ করে অবজ্ঞাসূচক একটি শব্দ ব্যবহার করেন। জবাবে চাখোয়ানও পাল্টা কটাক্ষ করেন।
এভাবে শুরু হওয়া বাগ্বিতণ্ডা একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। আর্মেনিয়ার পার্লামেন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশন তখন সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল। ফলে সংসদ সদস্যদের একে অপরকে ঘুষি ও লাথি মারার দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পার্লামেন্টের স্পিকার রুবেন রুবিনিয়ান সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তবে তিনি অধিবেশন স্থগিত করেননি কিংবা সরাসরি সম্প্রচারও বন্ধ করেননি।
তিনি বলেন, ‘আমি অধিবেশন স্থগিত করব না। আমি চাই সবাই এসব দেখুক।’
কিন্তু পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ডেপুটি স্পিকার ভাগন আলেকসানিয়ান বিরোধী সংসদ সদস্যদের দিকে একটি চেয়ার ছুড়ে মারেন। এরপর স্পিকার অধিবেশনে বিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হন। বিরতির সময়ও পার্লামেন্টের বাইরে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ বাগ্বিতণ্ডা চলে।
সংঘর্ষের পর ক্ষমা চাইলেন চাখোয়ান
বিরতি শেষে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য তারন চাখোয়ান পার্লামেন্টে ঘটে যাওয়া ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে তিনি বিরোধী সংসদ সদস্যদের আচরণকে ‘গুণ্ডামি’ বলে আখ্যা দেন।
চাখোয়ানের অভিযোগ, বিরোধীরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন।
তিনি বলেন, কোনো সংসদ সদস্যের ওপর হামলা করে বা মারামারি উসকে দিয়ে কেউ পার পেয়ে যাবেন—এমনটা ভাবার কারণ নেই। হামলা করে পাল্টা আঘাত ছাড়াই চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংঘর্ষের দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
পার্লামেন্টের এই ঘটনার জন্য ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীরা একে অপরকে দায়ী করেছে। স্পিকার রুবেন রুবিনিয়ানের দাবি, বিরোধী নেতা নারেক কারাপেতিয়ান প্রথমে তারন চাখোয়ানকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। তবে গার্নিক দাভতিয়ান নামের আরেক বিরোধী সংসদ সদস্য প্রথম আঘাতটি করেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, স্ট্রং আর্মেনিয়া দলের সংসদ সদস্য মারিয়ানা গাহরামানিয়ান এ ঘটনার জন্য স্পিকারকেই দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, স্পিকার রুবিনিয়ান ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য তারন চাখোয়ানের উসকানিমূলক বক্তব্যকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি কোনো কার্যকর পদক্ষেপও নেননি।
সহিংসতাকে সমর্থন প্রধানমন্ত্রীর
পার্লামেন্টে হাতাহাতির ঘটনায় সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান। তিনি সহিংসতার নিন্দা জানালেও ক্ষমতাসীন সিভিল কন্ট্রাক্ট পার্টির সংসদ সদস্যদের পদক্ষেপকে সমর্থন করেন।
এমনকি বিরোধীদের দিকে চেয়ার ছুড়ে মারাকেও তিনি পরিস্থিতির উপযুক্ত ও যুক্তিসংগত প্রতিক্রিয়া বলে মন্তব্য করেন। পাশিনিয়ান বলেন, কেউ সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কর্তৃপক্ষ তাদের হাত ভেঙে দেবে। দেশে অরাজক পরিস্থিতি ঠেকানো সরকারের দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এমন অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন দেশটির মানবাধিকার রক্ষক আনাহিত মানসিয়ান। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য সমাজে সহিংসতাকে সমর্থন করার প্রবণতা বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, পার্লামেন্ট কোনো ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক বিতর্ক ও মতপ্রকাশের জায়গা।