এক্সপ্লেইনার
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ও প্রভাব বুঝতে যা জানা প্রয়োজন
মধ্যবর্তী নির্বাচনে মঙ্গলবার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি কেন্দ্রে ভোট দেন তিনজন ভোটার। ছবি: এএফপি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ২০:১০ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ২০:৩৩
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষ- প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। ফেডারেল সরকার ব্যবস্থায় কোনো আইন কার্যকর হওয়ার আগে উভয় কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা তদারকির ক্ষেত্রেও এই দুই কক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মার্কিন কংগ্রেসের মেয়াদ অন্য দেশগুলোর মতো সরকারের মেয়াদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। দেশটির নিয়ম অনুযায়ী, ৪৩৫ আসনের নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য বাছাইয়ে প্রতি দুই বছর পর পর ভোট হয়। প্রেসিডেন্টের ৪ বছর মেয়াদের মাঝামাঝিতে ভোট হয় বলে এটিকে মধ্যবর্তী বা মিডটার্ম নির্বাচন বলে। এতে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয় না।
অন্যদিকে, সিনেটের সদস্য সংখ্যা ১০০। তাদের মেয়াদ ছয় বছর। তবে সব সদস্যের মেয়াদ একসঙ্গে শেষ হয় না। তাই প্রতি দুই বছর পর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এবার দুটি শূন্য আসনসহ ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে।
আর কোন পদে নির্বাচন হচ্ছে?
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এর সঙ্গে তিনটি আঞ্চলিক গভর্নর পদ আছে। সব মিলিয়ে ৩৯টি গভর্নর পদে নির্বাচন হচ্ছে। দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট ও গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ১০ কোটির বেশি ভোটার এবার ভোট দেবেন। তাদের মধ্যে ৫ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ আগাম ভোট দিয়েছেন। যা ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের তুলনায় বেশি।
অঙ্গরাজ্যের গভর্নর হলেন একটি রাজ্যের নির্বাচিত প্রধান নির্বাহী। তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব সংবিধান ও আইনসভা আছে। এগুলোর কর্তৃপক্ষই প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্বে থাকে।
ফলাফল কখন জানা যাবে?
সময়ের ব্যবধান থাকায় দেশটির একেক অঙ্গরাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। সাধারণভাবে ভোটকেন্দ্র খোলার কথা অঙ্গরাজ্যগুলোর স্থানীয় সময় সকাল ৬টায়। যা বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার বিকেল ৫টা।
এ হিসেবে প্রথম ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে ভরমন্ট, কানেকটিকাট, ইন্ডিয়ানা, কেন্টাকি, মেইন, নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্ক ও ভার্জিনিয়ায়। এগুলোতে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হবে বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টায়। বাকি অঙ্গরাজ্যগুলোতে ভোটগ্রহণ শেষ হতে হতে দুপুর ১২টা পার হতে পারে।

ফলে ৫০টি অঙ্গরাজ্যের আনুষ্ঠানিক ফলাফল জানাটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর কর্মকর্তারা ভোট গণনার ফল প্রকাশ শুরু করবেন। এরপর মার্কিন গণমাধ্যমগুলো সেই ফল বিশ্লেষণ করে বেসরকারিভাবে ফলাফল জানাবে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা হাড্ডাহাড্ডি হলে কোনো আসনের ফল চূড়ান্ত করতে কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিনও লাগতে পারে। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা একটি বা উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তা জানতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।
হাউসের ফলাফল বুঝতে যা জানা প্রয়োজন
প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য কোনো দলের ২১৮ আসন দরকার। বর্তমানে রিপাবলিকান পার্টির হাতে এতগুলো আসন আছে। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের হাতে আছে ২১৪টি। বাকি তিনটির মধ্যে ১টি স্বতন্ত্র ও দুটি শূন্য।
এবার রিপাবলিকান পার্টি ২১৮ আসন ধরে রাখতে পারলে তাদের হাতেই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটরা এই সংখ্যক আসন পেলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে যাবে তা নির্ধারণ করতে পারে ১৩টি অঙ্গরাজ্য। সেগুলো হলো- আরিজোনা, ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, ফ্লোরিডা, আইওয়া, মিশিগান, নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্ক, ওহাইও, পেনসিলভানিয়া, টেক্সাস, ভার্জিনিয়া ও উইসকিনসন।
এসব অঙ্গরাজ্যে প্রতিনিধি পরিষদের অধিকাংশ আসনই রিপাবলিকানদের হাতে। এবার সেগুলোর ভোট কাদের পক্ষে যাবে তা চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা করতে পারে।
সিনেটের ফলাফল বুঝতে যা জানা প্রয়োজন
কংগ্রেসের উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য দরকার ৫১টি আসন। বর্তমানে ডেমোক্র্যাট ও তাদের মিত্রদের ৪৭ আসনের বিপরীতে ৫৩ আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে আছে রিপাবলিকানরা। নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চাইলে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন বাড়াতে হবে।
মার্কিন নির্বাচনে প্রতিযোগিতার মাত্রা ও ফলাফল বিশ্লেষণ করার নির্দলীয় একটি সংস্থা ‘‘কুক পলিটিক্যাল’। তাদের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, সিনেটের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে সাতটি আসন। বর্তমানে এগুলোর অধিকাংশ রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
অঙ্গরাজ্যগুলো হলো- মিশিগান, আলাস্কা, টেক্সাস, ওহাইও, আইওয়া, কানসাস ও মেইন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এগুলোর মধ্যে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা অন্তত চারটি আসনে যদি ডেমোক্র্যাটরা জেতে তাহলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। সেক্ষেত্রে দলটিকে নিজেদের বর্তমান সব আসনও ধরে রাখতে হবে।

টাইমস ও সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোমবার প্রকাশিত সবশেষ জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে রিপাবলিকান সিনেটর আছেন এমন পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে। ষষ্ঠ অঙ্গরাজ্যে দুই দলের প্রার্থীর অবস্থান প্রায় সমান। সপ্তম অঙ্গরাজ্য মিশিগানে দলটির প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ প্রায় দুই অঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।
মিডটার্মে জয়-পরাজয়ের ঐতিহাসিক প্রবণতা কেমন?
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, এসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রায়ই আসন হারায়। কারণ, এ নির্বাচনকে সাধারণত প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলের কর্মকাণ্ডের ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে দেখা হয়।
১৯৩৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে হোয়াইট হাউসে ক্ষমতাসীন দল গড়ে প্রতিনিধি পরিষদে ২৮ ও সিনেটে চারটি আসন হারিয়েছে। এছাড়া, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতিও কম থাকে।
অপরদিকে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস গত ২০ অক্টোবর প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানায়, গত পাঁচটি মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল হাউসে গড়ে ৩১টি আসন হারিয়েছে। তবে সিনেটে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম এবং কখনো কখনো আসনও বাড়ে।
সবশেষ ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি হাউসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। সেবার তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৯টি আসনে জয়ের মাধ্যমে রিপাবলিকানরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তবে সিনেটে দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে ডেমোক্র্যাটরা।
নিয়ন্ত্রণ বদলের প্রভাব কেমন হতে পারে?
ক্ষমতাসীন দল হাউস বা সিনেটে নিয়ন্ত্রণ হারালে তা প্রেসিডেন্টের নিয়মিত পদক্ষেপগুলোর ওপর প্রভাব ফেলে। ডেমোক্র্যাটরা যদি এবার উভয়কক্ষে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় তাহলে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক কর্তৃত্ব দুর্বল হতে পারে।
বিশেষ করে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ পরিচালনা, আইন প্রণয়ন, বাজেট, নিয়োগ, বৈদেশিক সহায়তা আটকে রাখার মতো পদক্ষেপগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্প নিজেই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত বা অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।
অর্থাৎ, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালে ট্রাম্পের আগামী দুই বছরের মেয়াদ তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে হোয়াইট হাউস সূত্রের বরাত দিয়ে সম্প্রতি রয়টার্স জানায়, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প প্রস্তুতি নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সেটি হলো- কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে সরকার পরিচালনা করা। সেক্ষেত্রে তিনি নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করতে চাইছেন। এটিকে কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলো কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে পরিকল্পনা করেছেন হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা।