এক্সপ্লেইনার
ডেমোক্র্যাটরা কি এবার ইরান যুদ্ধ থামাতে বা ট্রাম্পের শুল্কনীতি বদলাতে পারবেন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
আল–জাজিরা
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ২২:২৩ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ২২:৩১
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। মঙ্গলবারের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে হারিয়ে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে দলটি। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরুর পর ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর ডেমোক্র্যাটদের নজরদারি বাড়বে। একই সঙ্গে তাদের আপত্তি থাকা আইন পাসের পথও আটকে দিতে পারবেন তারা।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেই প্রেসিডেন্টের সব ক্ষমতা সীমিত করা সম্ভব হবে না। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ, আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপ ও অভিবাসন নীতির মতো বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াতে পারলেও বড় পরিবর্তন আনা কঠিন হবে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আল–জাজিরার এক বিশ্লেষণে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
ইরান যুদ্ধ থামাতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব ছিল বলে স্বীকার করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্বাচনে পরাজয়ের একটি কারণ ইরান। তবে ইরান নিয়ে তার পদক্ষেপের গুরুত্বও মানুষ বুঝেছে বলে দাবি করেন তিনি।
নির্বাচনে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ভোটারদের অসন্তোষের কারণ হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং দেশের অভ্যন্তরীণ খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালিয়েছিল।
গত ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ান ট্রাম্প। নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি সামরিক হামলার নির্দেশ দিতে পারবেন। তবে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস সামরিক ব্যয়ের অর্থ অনুমোদন না করে চাপ তৈরি করতে পারে। আগামী ১১ ডিসেম্বর বর্তমান সরকারের অর্থায়নসংক্রান্ত বিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। নতুন কংগ্রেসে অতিরিক্ত সামরিক ব্যয়ের অর্থ অনুমোদন না করার চেষ্টা করতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা।
তবে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিকসের গবেষক জেমস বয়েজ মনে করেন, যুদ্ধের মধ্যে থাকা মার্কিন সেনাদের অর্থায়ন বন্ধ করা সহজ হবে না। এতে সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে- এমন সমালোচনাও তৈরি হতে পারে।
১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন ব্যবহার করেও ট্রাম্পকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ আইন অনুযায়ী, আসন্ন হামলা ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। তবে কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা না করলে ৬০ দিনের মধ্যে অভিযান বন্ধ করতে হয়। প্রেসিডেন্ট এ ধরনের সিদ্ধান্তে ভেটো দিতে পারেন। সেই ভেটো বাতিল করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।
আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাস বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা সীমিত থাকবে। তবে ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে পারে এমন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সমর্থন নিয়ে তারা নতুন আইন প্রস্তাব করতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শুরু থেকেই তিনি ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছেন। গত সপ্তাহে উত্তেজনা কমানো ও আলোচনা শুরুর উদ্যোগ হিসেবে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধানকে চিঠিও পাঠিয়েছেন তিনি।
জেমস বয়েজের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদের পর সংবিধান অনুযায়ী ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে নির্বাচনী চাপ না থাকায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও আক্রমণাত্মক নীতি নিতে পারেন তিনি। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দুর্বল অবস্থান কাটাতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়ে নিজের প্রেসিডেন্ট হিসেবে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও করতে পারেন।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি কি বদলাতে পারবে কংগ্রেস?
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর যুক্তিতে গত বছর প্রায় ৯০টি দেশের পণ্যে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। এতে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে ওই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। তবে আদালতের রায়ের পরও অন্য একটি আইনের আওতায় নির্বাহী আদেশ জারি করে শুল্কনীতি বহাল রাখেন ট্রাম্প। নতুন আদেশে শুল্কের হার ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এ শুল্কের মেয়াদ ১৫০ দিন। এরপর তা বহাল রাখতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, শুল্কনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। আমদানি পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের খরচ শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকেরা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেন। এ কারণে দলটি ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অর্থ নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছে।
নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা রপ্তানিকারকদের সাময়িক সুবিধা দিতে শুল্কের ক্ষেত্রে কিছু ছাড়ের প্রস্তাব করতে পারেন। তবে বাণিজ্যনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
জেমস বয়েজ বলেন, শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এখনো আইনি লড়াই চলছে। ইতিমধ্যে আদায় করা শুল্কের অর্থ সরকারকে ফেরত দিতে হবে কি না, দিলেও কতটা দিতে হবে, তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

তবে চীনের প্রযুক্তি খাতে প্রবেশাধিকার সীমিত করার বিষয়ে কংগ্রেসের দুই দলের আইনপ্রণেতারা একমত হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে রিমোট অ্যাকসেস সিকিউরিটি অ্যাক্ট ও চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো আইন নিয়ে আলোচনা এগোতে পারে। এসব আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য, সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিতে দূর থেকে প্রবেশের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ অনুমোদিত স্থানে রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হবে।
অভিবাসন নীতিতে বাড়বে তদন্ত
নির্বাচনের পর কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পাবেন ডেমোক্র্যাটরা। এসব কমিটির তদন্ত শুরু করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করার ক্ষমতা রয়েছে।
স্কট লুকাসের মতে, ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত হতে পারে। এমনকি ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের উদ্যোগও নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিও তদন্তের মুখে পড়তে পারে। শরণার্থী ও অভিবাসীদের বহিষ্কারের নীতি বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগ (আইআরএস) এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মধ্যে কী ধরনের সহযোগিতা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে চান ডেমোক্র্যাটরা।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই নীতি বাস্তবায়নে বিমানবন্দরে লোকজনকে আটক করা এবং অভিবাসন মামলার শুনানিতে তাদের হাজির করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ফক্স নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, নিবন্ধিত ভোটারদের ৫৩ শতাংশ মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযান মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের দাবি, আটক অভিবাসীদের প্রায় ৭০ শতাংশের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে একজন ব্যক্তিকে নির্দোষ বিবেচনার আইনি নীতির কারণে এ পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।
স্কট লুকাস বলেন, নির্বাচনের ফলাফলের কারণে ডেমোক্র্যাট ও দায়িত্বশীল রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা স্থানীয় এবং অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে পারবেন। এর মাধ্যমে অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে দায়িত্বশীল নীতি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। তবে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা, শুল্কনীতি পুরোপুরি বদলে দেওয়া কিংবা অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও কংগ্রেসের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে থাকবে।