কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখে ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৩:১৭
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে তুলে দেওয়ায় সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রতি বড় ধরনের অনাস্থা প্রকাশ করে এই রায় দিয়েছেন ভোটাররা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, ৮০ বছর বয়সী ট্রাম্পের জন্য এই ফলাফল ব্যক্তিগতভাবে বড় ধরনের অপমান। জ্বালানির আকাশছোঁয়া দাম এবং ইরানের সঙ্গে তাঁর ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষের জেরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাটরা বিজয়ী হয়েছেন।
সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ– কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ট্রাম্পের একচ্ছত্র প্রভাবের অবসান ঘটেছে। এখন ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন আইন প্রণয়নে বাধা দিতে পারবেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারবেন এবং তাঁর মনোনীত বিভিন্ন পদে নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা আন্দোলন এখন পিছু হটছে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে জেফ্রিস প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার সুযোগ পাবেন।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা ‘বিশাল ব্যবধানে’ জয়ী হতো। অথচ নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময় তিনি সমর্থকদের বারবার বলেছিলেন, তারা যেন ধরে নেন তিনিও ব্যালটে রয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের পাস করা বিলে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লাল রঙের একটি বেসবল ক্যাপের ছবি পোস্ট করেন, যাতে শুধু ‘ভেটো’ শব্দটি লেখা ছিল। তবে নতুন কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
একক কৃতিত্ব নেই
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ব্যবধানে এই জয়ের কৃতিত্ব ডেমোক্রেটিক পার্টির কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশ এককভাবে দাবি করতে পারবে না। বরং দলের সব অংশই এই জয়ের কৃতিত্বের দাবিদার। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, ৪৩৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে ২২৮ আসনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছে ১২৬ আসন। আর সিনেটে ৫৪টি আসন পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। মঙ্গলবার রাতে ডেমোক্রেটিক পার্টির সব ধারার নেতাকেই বিজয়ী হতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে ছিলেন মধ্যপন্থি, প্রগতিশীল, জনতুষ্টিবাদী এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, ডেমোক্র্যাটদের জয় এতটাই ব্যাপক ও বড় ব্যবধানের ছিল যে, দলের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দিয়ে এই ফলাফল ব্যাখ্যা করা কঠিন। এ বছর নির্বাচনে জিততে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিচয়টি প্রয়োজন ছিল, তা হলো তারা রিপাবলিকান নন।
ডেমোক্র্যাটদের জন্য একের পর এক রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন ট্রাম্প নিজেই। ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় যুদ্ধের কারণে বেড়েছে পণ্যমূল্য। তাঁর বিশৃঙ্খল শুল্কনীতি ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষক এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমানো, অভিবাসনবিরোধী বহিষ্কার অভিযান, ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির চেষ্টা এবং লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কার নিয়ে অন্তহীন বিতর্ক– সবকিছুই তাঁর বিরুদ্ধে গেছে।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের পদেও জয় পেয়েছেন তারা। একই সঙ্গে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আইনসভা ও গভর্নরের পদ– দুইয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য তৈরি করেছেন ডেমোক্র্যাটরা। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এমন অনেক এলাকায় তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, যেগুলো ছয় মাস আগেও দলটির সম্ভাব্য জয়ের তালিকায় ছিল না।
ক্যানসাস ও সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে নতুন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। বিশেষ করে ক্যানসাস ৯৪ বছর পর প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত করেছে। সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী ও বর্তমান সিনেটর ডারলাইন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। অঙ্গরাজ্যটি থেকে প্রায় তিন দশক পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। ১৯৯৮ সালের পর সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে আর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি।
টেক্সাসেও ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছেন। এমনকি গ্রামীণ এলাকার যেসব আসন থেকে আগে জয়ের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন ডেমোক্র্যাটরা, সেখানকার ভোটারদেরও নিজেদের পক্ষে আনতে পেরেছেন তারা। মেইনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে জেতাতে গিয়ে ভোটাররা যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে ৩০ বছর দায়িত্ব পালন করা এক অভিজ্ঞ রিপাবলিকান রাজনীতিককে পরাজিত করে দিয়েছেন।
আইওয়ার ডেস মইনেসে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী ফলাফল পর্যবেক্ষণের অনুষ্ঠানে উচ্ছ্বাসের মাত্রা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য। সেখানে গভর্নরের কার্যালয়, সিনেটের একটি আসন এবং প্রতিনিধি পরিষদের চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে জয় পেয়েছে দলটি। অঙ্গরাজ্যটির পরবর্তী গভর্নর নির্বাচিত হওয়া রব স্যান্ড বিজয়ী ভাষণে সমর্থকদের বলেন, ‘আইওয়ার ডেমোক্র্যাটদের জন্য গত কয়েক বছর বেশ কঠিন ছিল।
তবে এখন অঙ্গরাজ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সরকারব্যবস্থা আবার ফিরে এসেছে।’ পাশাপাশি আগে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা ওহাইও, নর্থ ক্যারোলাইনার নিয়ন্ত্রণও চলে গেছে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। সব মিলিয়ে সাতটি ঘাঁটি হারিয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। এদিকে জর্জিয়ায় গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট কিশা ল্যান্স। ইতিহাসে এই প্রথম মার্কিন কোনো অঙ্গরাজ্য কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর পেল।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের রচেস্টারের স্বতন্ত্র ভোটার রেবেকা কনরস বলেন, ট্রাম্পকে বার্তা দিতেই তিনি ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘তিনি (ট্রাম্প) সর্বত্র বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন।’ বিজয়ের পর মিনেসোটার নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর পেগি ফ্লানাগান বলেন, ‘এই অঙ্গরাজ্যজুড়ে এবং পুরো দেশেই মানুষ বলছে, এবার যথেষ্ট হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়া আশা প্রকাশ করেছে, ট্রাম্প তাঁর ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা’ অব্যাহত রাখবেন। অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা কাজ চালিয়ে যাবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না। এদিকে হরমুজ প্রণালিতে আক্রমণের একদিন পরে নির্বাচনের দিন ট্রাম্প জানান, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার পরিকল্পনা নেই তাঁর। এর প্রয়োজন পড়বে না। তবে তারা প্রস্তুত আছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত আবদুল এল-সায়েদ
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেটের শূন্য আসনে মঙ্গলবার জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। সংবাদমাধ্যমগুলোর নির্বাচনী পূর্বাভাস অনুযায়ী, তাঁর এই জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হলেন তিনি।
হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে এল-সায়েদের জয় ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের জন্য একটি বড় অর্জন। ৪২ বছর বয়সী এল-সায়েদ জনস্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা। নির্বাচনী প্রচারে তিনি কর্মজীবী পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং রাজনীতিতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
নির্বাচনে এল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ৬৩ বছর বয়সী মাইক রজার্স। তিনি কংগ্রেসের সাবেক সদস্য এবং এফবিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা। ট্রাম্প ও জাতীয় পর্যায়ের রিপাবলিকান নেতাদের জোরালো সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
রজার্স নির্বাচনী প্রচারে এল-সায়েদকে উগ্রপন্থি এবং ইসলামী চরমপন্থার প্রতি সহানুভূতিশীল প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে কথিত সম্পর্কের অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে এল-সায়েদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন