রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ক্ষোভ
প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন টেকাতে কৌশলী ভ্যান্স
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি-সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৫ | আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পর গত বুধবার এক সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর ওই পোস্টকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, ভ্যান্সের পোস্টটি ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি এবং দ্বিতীয় মেয়াদের কৌশলের বেশ কয়েকটি দিকের সমালোচনা করেছেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের এমন বড় পরাজয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একজন ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য ছিল ব্যতিক্রমী। মূলত নতুন রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ রয়েছে তাঁর সামনে। এর মাধ্যমে নিজের প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্নও টিকিয়ে রাখতে চান তিনি।
নেতৃত্বের ভূমিকায় আসতে চাইছেন ভ্যান্স
রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ নির্ধারণে নিজেকে অন্য নেতাদের মধ্যে অগ্রণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন তিনি। এটি রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের অংশ হলেও তাঁর এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ভ্যান্স তাঁর পোস্টে কিছুটা সংযত ভাষায় লিখেছেন, রিপাবলিকান দলের এক জনমত জরিপকারীর সঙ্গে তিনি একমত যে, প্রচারণার শেষ পর্যায়ে তাদের অর্থনৈতিক বার্তা যথেষ্ট জোরালো ছিল না। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ইরান যুদ্ধ ও অনিবন্ধিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান থেকেও নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন ভ্যান্স। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’ অভিবাসন নীতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আইন প্রয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তনের ধারণার প্রতি আমি আগ্রহী। যেমন, অবৈধ শ্রমিক নিয়োগকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।’
ভ্যান্স জানিয়েছেন, এক জনমত জরিপকারীর কাছে তিনি ভোটারদের আবার ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ধারণা পেয়েছেন। যুদ্ধ বন্ধ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির দিকে নজর দেওয়া, আমেরিকা ফার্স্ট নীতি অনুসরণ করা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিবর্তন করা– এই চারটি বিষয় এ ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্যে তিনি এখনও ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধে জড়াননি। তবে ভ্যান্স ও ট্রাম্পের অবস্থানের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে এখন অনেকটা আক্ষেপের সুরে কথা বলছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত রয়েছে যে, তিনি জেনেশুনেই রাজনৈতিক মূল্য দিয়েছেন। অন্যদিকে ভ্যান্সের বক্তব্য থেকে এমন ধারণা পাওয়া যায় যে, শুরু থেকেই যুদ্ধটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এবং এর জন্য বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে।
ডেস্যান্টিসও পরাজয়ের কারণ খুঁজছেন
২০২৮ সালের নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা শুধু ভ্যান্সই করছেন না। ২০২৪ সালের রিপাবলিকান প্রাইমারিতে ট্রাম্পের কাছে হেরে যাওয়া রন ডেস্যান্টিসও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছেন।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে ডেস্যান্টিস লিখেছেন, ‘২০২৮ সালে রিপাবলিকানদের পক্ষে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া খুবই কঠিন হবে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ হয়তো ২০৩২ সালের আগে আসবে না।’
মঙ্গলবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়কে ‘যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঞ্চলে দলটির জন্য গত ১০০ বছরের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বড় বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন ডেস্যান্টিস। তিনি আরও বলেন, ‘রিপাবলিকান পার্টির যদি টেক্সাসের মতো একটি শক্ত ঘাঁটি না থাকে, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে ভবিষ্যতে দলটি আর কার্যকর অবস্থানে থাকতে পারবে না।’
সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, ফ্লোরিডার গভর্নরের এসব মন্তব্যের উদ্দেশ্যও ভ্যান্সের মতোই। ভবিষ্যতে রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্বে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা।
রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ক্ষোভ
এদিকে, বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির শোচনীয় পরাজয়ের প্রাথমিক ধাক্কা কাটতে না কাটতেই দলটির ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অভিযোগ, নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখার বিষয়ে ট্রাম্পের অতিরিক্ত মনোযোগ এবং ভোটারদের উদ্বেগের প্রতি তাঁর উদাসীনতার কারণেই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হয়েছে দলটিকে।
টেক্সাসের প্রভাবশালী রিপাবলিকান লবিস্ট বিল মিলার বিবিসিকে বলেন, ‘এর দায় তাঁরই। অন্য কারও নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে পুরোপুরি ও সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ভোটাররা। এটি বড় ধরনের বিপর্যয়। এভাবে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছাবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি।’
কয়েকজন রিপাবলিকান সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জনপ্রিয়তা হারানো নীতি, প্রেসিডেন্ট হিসেবে কম অনুমোদন এবং ওয়াশিংটনে বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ততার কারণে ট্রাম্প দলকে আরও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
মিনেসোটার রিপাবলিকান কৌশলবিদ গ্রেগ পেপিন বলেন, ‘একটির পর একটি ভুল হয়েছে। স্পষ্টতই একের পর এক রাজ্যে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্টের নীতিগুলো মানুষ পছন্দ করেনি।’ ওই ব্যক্তি বলেন, ‘দলের ভেতরে কীভাবে পুরো পরিস্থিতি এগিয়েছে, তা নিয়ে স্পষ্ট হতাশা রয়েছে।’ এই হতাশার বড় অংশই ট্রাম্পের দিকে নির্দেশিত। তাঁর ভাষায়, ট্রাম্পের প্রতি ক্ষোভ ‘অত্যন্ত বেশি’।
এখন নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ পর্যালোচনা করতে গিয়ে রিপাবলিকানদের কয়েকজন ইতোমধ্যে ২০২৮ সালের নির্বাচন নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। রাজ্যের রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির (আরএনসি) সদস্য শেফলার বলেন, ‘প্রার্থী জেডি ভ্যান্স, মার্কো রুবিও কিংবা টেড ক্রুজ– যেই হোন না কেন, আমাদের হাতে বেশ কয়েকজন যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। প্রতিযোগিতাটি উন্মুক্ত থাকবে।’
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- জেডি ভ্যান্স