ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

কে এই স্টিফেন মিলার, যার ওপর এত আস্থা ট্রাম্পের

২০১৬ সাল থেকেই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ, অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অন্যতম পরিকল্পনাকারী

কে এই স্টিফেন মিলার, যার ওপর এত আস্থা ট্রাম্পের
×
×

স্টিফেন মিলার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৬:৪২

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। শুক্রবার এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনে অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অন্যতম প্রবক্তা মিলারের প্রভাব আরও বাড়ল বলে মনে করা হচ্ছে।

৪১ বছর বয়সী মিলার ২০১৬ সাল থেকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিবাসন নীতি প্রণয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে বহিষ্কারের কর্মসূচির অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবেও পরিচিত তিনি।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প মিলারকে তার ‘সবচেয়ে বিশ্বস্ত উপদেষ্টাদের একজন’ বলে উল্লেখ করেছেন। সোমবার থেকে তিনি সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হবেন।

এ সপ্তাহের শুরুতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তকে তার বিতর্কিত নীতিগুলোর প্রতি আরও জোরালো সমর্থন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার কথা। ফলে হোয়াইট হাউসে মিলারের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজনীতিতে উত্থান যেভাবে
ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগেই রক্ষণশীল রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন মিলার। ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকা হাইস্কুলে পড়ার সময় স্থানীয় বেতার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বিদ্যালয়ের কথিত উদারনৈতিক নীতির সমালোচনা করতেন।

ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ডিউক কনজারভেটিভ ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ল্যাক্রস খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর তাদের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।

পড়াশোনা শেষে ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে রিপাবলিকান দলের কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য এবং সিনেটর জেফ সেশনসের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে যোগ দেন মিলার। ওই প্রচারে ট্রাম্পের বক্তব্য ও রাজনৈতিক ভাষা তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়। ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন ২০১৭ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছিলেন, শুরু থেকেই ট্রাম্প ও মিলারের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া ছিল। ট্রাম্পকে নিজের রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরন খুঁজে পেতে সহায়তা করেছিলেন মিলার।

প্রথম মেয়াদে অভিবাসন নীতিতে প্রভাব
২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ও বক্তৃতা লেখক হিসেবে দায়িত্ব পান মিলার। অভিবাসন বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ নীতিকে তিনি প্রায়ই পশ্চিমা ‘সভ্যতা’ রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরতেন।

তবে তার বক্তব্য ও অবস্থান নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের কেউ কেউ তার বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী বক্তব্যকে উৎসাহিত করার অভিযোগ তোলেন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টার কিছু ই-মেইল প্রকাশ করে। তাদের দাবি, এসব ই-মেইলে মিলারের শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ওয়েবসাইট ও মতাদর্শের প্রতি সমর্থনের প্রমাণ রয়েছে। এ ঘটনার পর তাকে হোয়াইট হাউস থেকে সরানোর দাবি জোরালো হয়।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সীমান্তে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি চালু করে। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ককে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া ওই নীতি প্রণয়নে মিলারের ভূমিকা ছিল বলে তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে সীমান্তে অভিভাবকদের কাছ থেকে শিশুদের আলাদা করে ফেলার ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তীব্র সমালোচনার মুখে পরে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নীতিটি পরিবর্তন করেন ট্রাম্প।

শৈশবে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার কর্মসূচি ডাকা (ডিএসিএ) বন্ধের পক্ষেও কাজ করেন মিলার। এ ছাড়া ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ সালে কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারির নীতিতেও তার ভূমিকা ছিল। এটি ‘মুসলিম ট্রাভেল ব্যান’ নামে পরিচিতি পায়।

প্রথম দফায় সিরিয়া, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকদের ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরে পরিবর্তিত নিষেধাজ্ঞার একটি সংস্করণ দেশটির সুপ্রিম কোর্টে বহাল থাকে।

২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ট্রাম্পকে হারানো হয়েছে- এমন ভিত্তিহীন দাবির পক্ষেও অবস্থান নেন মিলার। নির্বাচনে জয়ের স্বীকৃতি ট্রাম্পকে দেওয়ার একটি পরিকল্পনাকেও তিনি সমর্থন করেছিলেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আরও ক্ষমতাধর
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সময়ও তার পাশে ছিলেন মিলার। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরলে তাকে নীতিবিষয়ক উপপ্রধান এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে বহিষ্কারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তিনি। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশজুড়ে অভিবাসন কর্মকর্তাদের তৎপরতা বেড়েছে। এমনকি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত নন, এমন ব্যক্তিরাও অভিযানের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন।

২০২৫ সালের মে মাসে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিলার বলেছিলেন, প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রশাসন। ট্রাম্প এ সংখ্যা আরও বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়ে যাবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অভিবাসন কর্মকর্তাদের ক্রমবর্ধমান কঠোর অভিযান ও সহিংসতার অভিযোগের পক্ষেও সরব ছিলেন মিলার। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে এক অভিযানে রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নামের দুজন নিহত হওয়ার পর তাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। পরে প্রেটির বিষয়ে নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেন।

ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা ভিসাধারী ও স্থায়ী বাসিন্দাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগেও ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা রয়েছে। এ নীতি প্রণয়নে মিলারের ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত জুলাইয়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিল ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাদের মধ্যে মিলারও রয়েছেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, খলিল ও অন্য অ-মার্কিন ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্যবস্তু করতে কর্মকর্তারা ষড়যন্ত্র করেছেন। ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে খলিল এখনো বহিষ্কারপ্রক্রিয়ার মুখে রয়েছেন।

ফিলিস্তিনপন্থী মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালাইবেরও সমালোচনা করেছেন মিলার। ২০২৩ সালে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তালাইবকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তাঁকে ও কয়েকজন ডেমোক্র্যাটকে ‘গভীরভাবে ইহুদিবিদ্বেষী ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার বাতিলের উদ্যোগেও ভূমিকা রাখেন মিলার। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। এ ছাড়া পশ্চিম গোলার্ধে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপগুলোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন তিনি।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আটক করার ঘটনাকে সমর্থন করেন মিলার। গত জানুয়ারিতে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সামরিক শক্তির ভিত্তিতে গ্রিনল্যান্ড দখলের অধিকারও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তাঁর ভাষায়, আন্তর্জাতিক সৌজন্য বা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চেয়ে বিশ্বে শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতাই অনেক সময় নির্ধারক হয়ে ওঠে।

চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব কী
হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ প্রেসিডেন্টের দপ্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ। এ পদে থাকা ব্যক্তি সাধারণত হোয়াইট হাউসের কর্মীদের তদারক, নিয়োগ, প্রেসিডেন্টের কর্মসূচি ও সময়সূচি ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন।

প্রেসিডেন্টের কাছে কোন তথ্য পৌঁছাবে, কারা তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন- এসব ক্ষেত্রেও চিফ অব স্টাফের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এ কারণে পদটিকে অনেক সময় প্রেসিডেন্সির ‘দ্বাররক্ষক’ বলা হয়।

মিলার নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর ট্রাম্পের ওপর তার প্রভাব কতটা বাড়বে, তা এখনই স্পষ্ট নয়। তবে অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে তার দীর্ঘদিনের ভূমিকার কারণে নতুন দায়িত্বে তার সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের দিকে নজর থাকবে।
সূত্র: আল-জাজিরা

আরও পড়ুন

×