ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সাহিত্যে নোবেল কে পাচ্ছেন

সাহিত্যে নোবেল কে পাচ্ছেন
×
×

আবু সুফিয়ান নিলয়

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইউরোপে গ্রীষ্মের ছুটি শেষ হয়ে গেছে। স্কুল-কলেজ খুলে যাবে শিগগির। এর অর্থ, নোবেল পুরস্কারের জন্য যে কথাসাহিত্যিক বা কবির সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি হয়েছিল তাদের বইপত্র পড়া শেষ করেছেন বিচারকরা।‌ এখন যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার কে পাবেন– সেটা ঘোষণা করা হবে অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ। সময়টা বেশি দূরে নয়।
কে পেতে পারেন ২০২৬-এ সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার– এ রকম ভবিষ্যদ্বাণী করা সহজ নয়। তবে আন্তর্জাতিক বুকমেকার, বাজি ধরার সাইট এবং সাহিত্য সমালোচকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী কয়েকজন কবি-সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করা যায়। 
চীনের পরাবাস্তববাদী লেখিকা ক্যান জুয়ের নাম কয়েক বছর ধরে শোনা যাচ্ছে। ব্রিটিশ জুয়াড়ি প্রতিষ্ঠান ল্যাডব্রোকের তালিকায় তাঁর বাজারদর ১০/১। অর্থাৎ পাবেন না। নোবেল পুরস্কার কখনও পরাবাস্তববাদী লেখককে দেওয়া হবে বলে মনে হয় না।
বিশ্বজুড়ে সবার প্রিয় লেখক জাপানের হারুকি মুরাকামি। সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দ্য সিটি অ্যান্ড ইটস আনসার্টেন ওয়ালস’। বিড়াল, লাইব্রেরি, রহস্যময় পাতাল বা কুয়ো, গান এবং পরাবাস্তবতার মতো তাঁর সিগনেচার উপাদানগুলো এ উপন্যাসে খুব পরিপক্বভাবে ফিরে এসেছে আবার। হয়তো শেষ পর্যন্ত পাবেন না মুরাকামিও। কারণ, গত বছর দক্ষিণ কোরিয়াতে গেছে নোবেল পুরস্কার। এবার দূরপ্রাচ্য থেকে অন্যদিকে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। তবে দেখে ভালো লাগল যে, ল্যাডব্রোকের তালিকায় ১৪/১ অনুপাত নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন মুরাকামি।
তৃতীয় স্থানে আছেন টমাস পিঞ্চন ও জেরাল্ড মারনেন। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২৩ সালে নরওয়ের ইয়োন ফসে, ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার হান কাং এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে হাঙ্গেরির প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই সাহিত্যের নোবেল থলেতে ভরেছিলেন। আশা করা অসংগত হবে না যে, এবার হয়তো উত্তর বা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো প্রভাবশালী লেখক নোবেল পেতে পারেন। তবে এ কথাও মনে রাখতে হয় যে, সুইডিশ একাডেমি প্রায়শ সব পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে চমক দিতে পছন্দ করে। 
নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা কেবল নন্দনতাত্ত্বিক সৌন্দর্য নয়, বরং নিপীড়িত, দলিত এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের লড়াই ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বরকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করে।
কেনিয়ার বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক এবং নোবেল পুরস্কারের আজীবন দাবিদার এনগুগি ওয়া থিয়ঙ্গো। ২০২৫ সালের ২৮ মে ৮৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু নোবেল পুরস্কার মরণোত্তর দেওয়া হয় না, তাই এনগুগির নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা আর নেই।
এনগুগি প্রয়াত, কিন্তু সামগ্রিকভাবে আফ্রিকা মহাদেশে নিপীড়িত ও দলিতদের জয়গান গাওয়া এখনও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী লেখক আছেন, যাদের কথা বিবেচনা করা যায়। সোমালিয়ার নুরউদ্দিন ফারাহ দীর্ঘদিন ধরে নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন। তাঁর উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু হলো সোমালিয়ার যাযাবর মানুষের জীবন, স্বৈরাচারী শাসন, নারীর ওপর সামাজিক নিপীড়ন এবং গৃহযুদ্ধের দুঃসহ অভিজ্ঞতা। সোমালিয়ার অত্যন্ত রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কলম সব সময়ই সোচ্চার। তাঁর প্রথম বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফ্রম আ ক্রুকেড রিব’ আফ্রিকান সাহিত্যের ইতিহাসে নারীবাদী অন্বেষণের এক মাইলফলক বলে স্বীকার করা হয়। এবার নুরউদ্দিন ফারাহ’র সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলে মনে হচ্ছে। জুয়াড়িদের হিসাব অনুযায়ী তিনি শীর্ষ তিনে না থাকলেও নোবেল কমিটির সেই চিরচেনা “সারপ্রাইজ বা শক ফ্যাক্টর” হিসেবে তাঁর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা আদৌ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি ইতোমধ্যে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘নিউস্ট্যাড ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর লিটারেচার’ (যাকে নোবেলের বিকল্প বা নোবেলের ঠিক আগের ধাপ মনে করা হয়) লাভ করেছেন।
আফ্রিকার আরও কয়েকজনের নাম বলা যায়। যেমন– জেকস মডা বর্ণবাদ-উত্তর দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ঔপন্যাসিকদের একজন। তাঁর লেখায় দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, দারিদ্র্য এবং বর্ণবাদের ক্ষত খুব নিপুণভাবে উঠে এসেছে। একটি উপন্যাস ‘মৃত্যুর নানা পথ’ অসামান্য একটি পাঠ অভিজ্ঞতার উৎস। ১৯৯১-এ ন্যাডেইন গর্ডিমার এবং ২০০৩ সালে জে. এম. কোয়েটসির পর এবার তিনি ন্যায্যভাবেই বিবেচিত হতে পারেন।
মোজাম্বিকের মিয়া কুতো আফ্রিকার অন্যতম সেরা জাদুবাস্তবতাবাদী লেখক। পর্তুগিজ ভাষায় লিখলেও তাঁর উপন্যাসের মূল উপজীব্য হলো মোজাম্বিকের গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত সাধারণ মানুষ, উপজাতীয় লোকগাথা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের লড়াই। তিনি হয়তো প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন। দেখা যাক পানি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়। 
জিম্বাবুয়ের লেখিকা ও অ্যাক্টিভিস্ট টিটসি ডাঙ্গারেমবগা তাঁর ‘নার্ভাস কন্ডিশনস’ উপন্যাসের জন্য খ্যাতিমান। আফ্রিকার নারীদের ওপর ঔপনিবেশিক এবং পুরুষতান্ত্রিক দ্বৈত নিপীড়নের বিরুদ্ধে টিটসি সদা সোচ্চার একটি কণ্ঠস্বর। বুকার প্রাইজের শর্টলিস্টেড হওয়া এই লেখিকাকে নোবেল কমিটি ‘অপ্রত্যাশিত চমক’ হিসেবে বেছে নিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
ব্রিটিশ ঐতিহাসিক-কথাসাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম হিলারি ম্যান্টেল। তাঁর অসামান্য রচনা ‘উলফ হল’ ট্রিলজির জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ২০২২ সালে প্রয়াত না হলে তাঁর এ রচনা বিবেচিত হতো– এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বাংলাদেশি পাঠকদের অতিপরিচিত সালমান রুশদিও আছেন বাজিকরদের তালিকায়। তাঁর দর ২০/১। ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান এই লেখক দীর্ঘ সময় ধরে নোবেল কমিটির রাডারে আছেন। তাঁর ‘ফ্রিডম অব স্পিচ’ মানুষের জীবনের ওপর আরোপিত মারাত্মক আঘাত এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ম্যাজিক রিয়েলিজম সাহিত্যের ইতিহাসকে বড় ধরনের মোচড় দিয়েছে। নোবেল কমিটি তাঁকে দিয়ে বিশ্বকে একটি বড় বার্তা দিতেই পারে। 
বাজির বাজারে ভিন্ন ভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন অসাধারণ সমকালীন কথাসাহিত্যিক শীর্ষ তালিকায় শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন– মেক্সিকোর  কথাসাহিত্যিক ক্রিস্টিনা রিভেরা গারজা। তাঁর বাজির দর ১৬/১। তিনি সমকালীন মোহিকান সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তাঁর রচনায় মেক্সিকোর রাজনৈতিক সংঘাত, নারীদের ওপর সহিংসতা এবং স্মৃতির মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
সিজার আইরাকে বলা হয় লাতিন আমেরিকার কিংবদন্তি। তিনি প্রতি বছরই ছোট ছোট কিন্তু ভীষণ নিরীক্ষাধর্মী ও অদ্ভুত প্লটের উপন্যাস লিখে চমকে দিচ্ছেন বিশ্বপাঠকদের।
রোমানিয়ার মিরসিয়া কার্তারেস্কু ইউরোপীয় উত্তর-আধুনিক সাহিত্যের এক জাদুকর। তাঁর অত্যন্ত জটিল, মেটাফিজিক্যাল এবং স্বপ্নিল (Dream-like) গদ্যের জন্য তিনি সমাদৃত। তাঁর বাজির দর: ১৬/১।
২০২৬ সালের নোবেল কি কবিতার          দিকে যেতে পারে? 
বাজিকরদের কাছে কানাডার কবি অ্যান কার্সন ১৪:১ অনুপাত নিয়ে ওপরের দিকে আছেন। জুয়াড়িদের তালিকায় আছেন চিলির রাউল জুরিতা (বাজির দর: ২০/১)। তাঁর কবিতায় শোনা যায় নিপীড়িত ও শোষিতদের জয়গাথা। আর তাঁর ভৌগোলিক অবস্থানও লক্ষ্য করার মতো: ‘লাতিন আমেরিকা’। চিলির পিনোশের স্বৈরশাসনের সময় তাঁকে বন্দি ও নির্যাতন করা হয়েছিল। তাঁর কবিতায় চিলির সাধারণ মানুষের ওপর হওয়া রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, রাজনৈতিক ক্ষত এবং লাতিন আমেরিকার ভৌগোলিক ল্যান্ডস্কেপ একাকার হয়ে গেছে। পাবলো নেরুদার পর চিলির অন্যতম প্রধান কবি মনে করা হয় তাঁকে।
কবি আদোনিসের কথা বিস্মৃত হওয়া প্রশ্নাতীত। তিনি আধুনিক আরবি কবিতার ঈশ্বর। স্বৈরতন্ত্র, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত আরবের মানুষের আর্তনাদ ও সংস্কৃতির সংকট তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। ৮৬ বছরের এই কবিও দীর্ঘকাল ধরে নোবেলের অন্যতম প্রধান দাবিদার। নোবেল যদি কবিতার দিকে যায় তবে তা আদোনিসের থলের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। 

আরও পড়ুন

×